জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমন্বিত বিনিয়োগের তাগিদ

ঢাকায় বাংলাদেশ জলবায়ু উন্নয়ন অংশীদারত্ব জ্ঞান সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।

জাতীয় জলবায়ু নীতি ও পরিকল্পনাকে সমন্বিত কর্মসূচি, মানসম্মত প্রকল্প, উপযুক্ত অর্থায়ন ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেছেন, বর্তমানের উন্নয়ন সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের জলবায়ু ঝুঁকিকে প্রভাবিত করবে। তাই বড় ধরনের প্রতিটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বুধবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ জলবায়ু উন্নয়ন অংশীদারত্ব জ্ঞান সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি সম্মেলনের অংশ হিসেবে জলবায়ু উন্নয়ন অংশীদারত্বের তথ্যভিত্তিক অনলাইন পোর্টালের উদ্বোধন করেন।

মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু অভিযোজনের বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি আয় সৃষ্টি করে না। তবে এসব বিনিয়োগ মানুষের জীবন ও জনকল্যাণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও আর্থিক সক্ষমতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।

তিনি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জলবায়ু প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন।

উদ্বোধন করা অনলাইন পোর্টালটির মাধ্যমে জলবায়ু সম্পর্কিত প্রকল্প ও বিনিয়োগের তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়বে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রকল্প তৈরির ধারাও আরও কার্যকর করার সুযোগ থাকবে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে জলবায়ু পরিকল্পনায় কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের পাশাপাশি জলবায়ু সম্পদের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ুর কারণে অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি অব্যাহত রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ফসল উৎপাদন হ্রাস এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তে থাকা প্রভাব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি কম কার্বন নিঃসরণকারী উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক বাস ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু উন্নয়ন অংশীদারত্বের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণও কামনা করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের অভিজ্ঞতা সাহস, উদ্ভাবন ও মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের ফল। জলবায়ু অভিযোজনের কাজে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও মালিকানা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

তিনি সহজলভ্য ও ন্যায্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক অভিযোজনের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে বিনিময়ের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সত্যা শ্রীনিবাস লোল্লা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, সম্মেলনের সাফল্য পরবর্তী পদক্ষেপ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

তিনি অর্থায়ন, কারিগরি দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও অংশীদারত্বকে সমন্বিত করে বাংলাদেশকে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

সম্মেলনের প্রথম দিনের আলোচনায় জলবায়ু সহনশীলতা, কম কার্বন নিঃসরণভিত্তিক প্রবৃদ্ধি, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বাস্তবায়নের বিষয় গুরুত্ব পায়।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে জ্বালানি রূপান্তর, কম কার্বন নিঃসরণকারী পরিবহন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।

জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩–২০৫০ এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের তৃতীয় সংস্করণ বাস্তবায়নে সমন্বয়, অর্থায়ন ও অংশীদারত্ব জোরদার করা সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানমের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যুগ্ম সচিব মুনিরা সুলতানা।

মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগিতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে পাঁচ শতাধিক নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *