বিজয় মজুমদার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাঙালির কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একধরনের ধৃষ্টতা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তিনি এতটাই সমৃদ্ধ করেছেন যে তাঁকে ছাড়া বাংলা সাহিত্য কল্পনাই করা যায় না। তাঁর রচনা বিশ্বের বহু মানুষের কাছে দর্শন হিসেবে বিবেচিত। জীবদ্দশায় ‘কবিগুরু’ সম্মানে ভূষিত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ইউরোপের বাইরে জন্ম নেওয়া প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন।
শুধু সাহিত্যের জগতেই নয়, সংগীতের জগতেও তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি কেবল একটি নয়, দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। শুধু তা-ই নয়, শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের ভাষা ও সুরও তাঁর রচনা দ্বারা প্রভাবিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ব্রিটিশ ভারতে। তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চার বিস্তার ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতার দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছিল।
রবীন্দ্রনাথের লেখা যখন বৃহত্তর পাঠকমহলে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে, তখনই ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলনও গতি পেতে থাকে। এই আন্দোলনে যাঁরা প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতিতে কিংবা অহিংস উপায়ে লড়াই করছিলেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সুসম্পর্ক ছিল। তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রধান পরিচয় বিদ্রোহ কিংবা উগ্রতার প্রকাশ নয়; বরং মানুষের মন, সমাজ, প্রকৃতি ও জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার এক অনন্য প্রয়াস।
একজন ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে জীবন কাটিয়েও তিনি যে কাজটি সবচেয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছেন, তা হলো লেখা। মনের আনন্দে তিনি লিখেছেন পদ্য, গদ্য, উপন্যাস, নাটক, ভ্রমণকাহিনি—সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তাঁর পদচারণা ছিল না। তাঁর সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এমন এক সমৃদ্ধি দিয়েছে, যা আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বকবি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সময় বাংলাদেশ তো দূরের কথা, ভারতও স্বাধীন হয়নি। তবে তত দিনে ভারতের মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের চিন্তায় মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়ে উঠছিল। উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র তখনও অনিশ্চিত, কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতীয় পরিচয়কে ঘিরে নানা বিতর্ক ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণ করছিল।
রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সাহিত্যিক পরিচয়কেই রবীন্দ্রনাথ সব সময় প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে দুটি ঘটনায় তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছিলেন—একটি বঙ্গভঙ্গ, অন্যটি পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। এই দুই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, মানবিক অবস্থান এবং ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিশেষ কিছু দিক সামনে আসে।
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে বিভক্ত করে। পূর্ববঙ্গের জেলাগুলোকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে গঠন করা হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ। এর রাজধানী করা হয় ঢাকা। এই সিদ্ধান্তে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের একটি অংশ আশাবাদী হয়ে উঠলেও বাংলার হিন্দুদের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল যে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের আড়ালে বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, পূর্ব বাংলার মুসলমানদের একাংশ মনে করেছিলেন, নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে তাঁরা শিক্ষা, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধিকতর সুযোগ পাবেন।
ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা বিভাজন করে শাসন করার নীতি কাজ করেছিল—এমন ব্যাখ্যা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
কেন হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন? সে সময় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিল ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তম প্রদেশগুলোর একটি। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বিহার ও উড়িষ্যাও। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতাকারী বাঙালিদের আশঙ্কা ছিল, প্রশাসনিক বিভাজনের ফলে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাবে এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়বে। তাঁদের কাছে বঙ্গভঙ্গ কেবল প্রশাসনিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয় ছিল না; এটি ছিল বাঙালির ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।
১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। দিনটিকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের আহ্বান জানান। রাখিবন্ধনের প্রতীক ব্যবহার করে তিনি দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। তাঁর আহ্বান ছিল, হিন্দুরা যেন তাঁদের মুসলমান ভাইদের হাতে রাখি বেঁধে দিয়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতাকে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
সে সময় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলমানও বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা আতিকুল্লাহ। এ ছাড়া রাজনীতিবিদ খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইউসুফ, আবদুল হালিম গজনভী এবং লেখক ইসমাইল হোসেন সিরাজীর নামও উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অবস্থানের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেচনা থাকলেও, বঙ্গভঙ্গবিরোধী মুসলমানদের একটি অংশের লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর ঐক্য বজায় রাখা।
একই সময়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক হিন্দু-মুসলমানের সংহতির প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হন। মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও পৃথক রাষ্ট্রের দাবির ইতিহাসেও তাঁর নাম বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এই দুই দিক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তৎকালীন রাজনীতিকে কেবল বঙ্গভঙ্গের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থানের সরল বিভাজনে ব্যাখ্যা করা যায় না। একই ব্যক্তির রাজনৈতিক চিন্তায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, আঞ্চলিক পরিচয় ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন পাশাপাশি উপস্থিত থাকতে পারে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় যেন একসময় স্বাধীনতার দাবিতে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ ছিল। অখণ্ড পাকিস্তানের ধারণাকে শক্তিশালী করার নামে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ভাষা। একই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের প্রতিও বৈরী মনোভাব প্রকাশ পেতে থাকে। এর শিকার হয়েছিলেন আবুল কাসেম মোহাম্মদ ফজলুল হকও, যিনি ‘শেরেবাংলা’ উপাধিতে পরিচিত ছিলেন। বাঙালির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অধীন রাখার প্রবণতা ক্রমে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিকাশ যেন গতি না পায়, সে লক্ষ্যেই প্রথমে বাংলা ভাষার ওপর আঘাত আসে—এমন ব্যাখ্যা পূর্ব বাংলার ভাষা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিকে ‘হিন্দু সংস্কৃতি’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতাও দেখা যায়। এর ফলে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে পরিচয়ের প্রশ্নটি রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধারণ করা কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় ও আদর্শিক বিরোধিতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদী দর্শন এবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন অভিযোগ ইতিহাসের নানা আলোচনায় উঠে এসেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টায় এসব প্রবণতার প্রভাবও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে বাঙালির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় কতটা উদ্বেগের বিষয় ছিল, তার বড় প্রমাণ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক সংকটকে এমন এক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়, যার শেষ পরিণতি ছিল পাকিস্তানের ভাঙন। বাঙালির নির্বাচনী রায়কে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথকে ত্বরান্বিত করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পরিসরে রবীন্দ্রনাথবিরোধিতার রাজনৈতিক প্রয়োজন অনেকটাই বদলে যায়। রবীন্দ্রনাথ তখন আর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা জাতীয় গৌরবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের উত্তরাধিকার স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। যে ভূখণ্ডে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সেই ভূখণ্ডই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তার পুরোনো বিতর্ক বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন অর্থ ধারণ করে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের জন্য আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি শেষ হয়ে যায়নি। সিন্ধি, পশতু কিংবা অন্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় ও সাংস্কৃতিক অধিকারকে ঘিরে সেখানে নতুন নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোনো কবি যখন নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির গৌরব তুলে ধরেন, তখন সেই সাহিত্যকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এ প্রশ্ন পাকিস্তানের মতো বহুভাষিক রাষ্ট্রে এখনও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের জন্য রবীন্দ্রনাথ এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন সাহিত্যিক। তাঁর লেখা, তাঁর সাহিত্যকর্ম এবং সংগীত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় গভীরভাবে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ আজ স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ফলে তাঁকে কেবল একজন অতীতের কবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও তাঁর উত্তরাধিকার যুক্ত।
তারপরও পাকিস্তান আমলের রবীন্দ্রভীতির মতো একটি চিন্তাধারার প্রভাব আমাদের সমাজে এখনও রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি মাখানোর ঘটনায়। কোনো সাহিত্যিকের প্রতি মতভেদ বা সমালোচনা প্রকাশের বদলে তাঁর প্রতিকৃতি কিংবা শিল্পকর্মকে অসম্মান করার মধ্য দিয়ে যে মনোভাব প্রকাশ পায়, তা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি বাংলাদেশের কারও কারও বিদ্বেষের একটি যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়—তিনি নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। এই অভিযোগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তিনি নাকি বাঙালির স্বার্থের বিরোধী ছিলেন। অথচ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের ঐতিহাসিক ভিত্তি কী, তা যাচাই না করেই অনেকে সেটিকে সত্য বলে প্রচার করেন। রবীন্দ্রনাথকে অপছন্দ করার পূর্বনির্ধারিত মনোভাবের কাছে ইতিহাসের তথ্য ও প্রমাণ অনেক সময় গুরুত্ব হারায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় রবীন্দ্রনাথের অংশগ্রহণের যে বহুল প্রচারিত গল্প রয়েছে, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় আয়োজিত এক সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ হাজির করা জরুরি। রবীন্দ্রনাথের অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সমসাময়িক সংবাদপত্র, সভার বিবরণ, চিঠিপত্র এবং অন্যান্য প্রাথমিক ঐতিহাসিক নথি পরীক্ষা করতে হবে।
এই অভিযোগের বিপরীতে একটি বক্তব্য হলো, যে সময়ে কলকাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা নিয়ে আলোচনা বা সভা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, সে সময়ে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে ছিলেন। এই তথ্যকে যথাযথ ঐতিহাসিক নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ, কারও অবস্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা আবশ্যক।
গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন—এমন দাবির পক্ষে প্রমাণ না পাওয়া গেলে সেই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু এরপরও রবীন্দ্রবিদ্বেষীরা কখনো কখনো আরেকটি যুক্তি সামনে আনেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সুসম্পর্ক ছিল; তাই তিনি হয়তো তাঁদের অবস্থানের সঙ্গে একমত ছিলেন।
এই যুক্তির দুর্বলতা বোঝার জন্য ইতিহাসচর্চার একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা দরকার। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে অন্য একজনের সুসম্পর্ক থাকলেই তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে অবস্থান অভিন্ন হয়ে যায় না। ব্যক্তিগত পরিচয়, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক মতৈক্য এক বিষয় নয়। কারও সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার ভিত্তিতে তিনি কোনো সভায় অংশ নিয়েছিলেন বা কোনো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
একইভাবে, কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে সমসাময়িক সংবাদপত্রে সংবাদ প্রকাশিত না হওয়াকে এককভাবে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করাও সতর্কতার দাবি রাখে। সংবাদপত্রে কী প্রকাশিত হয়েছিল, কোন সংবাদ বাদ পড়েছিল এবং কোন নথি বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে—এসব বিবেচনা না করে শুধু সংবাদ প্রকাশের অনুপস্থিতি থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা কঠিন। রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তিতে তাই অনুমান বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাখ্যার চেয়ে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক নথির গুরুত্ব বেশি।
এখানে মূল প্রশ্নটি শুধু রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা কি প্রমাণের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, নাকি আগে থেকে তৈরি বিদ্বেষকে সমর্থন করার জন্য ইতিহাসের একটি সুবিধাজনক বয়ান তৈরি করা হবে? রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি মিথ্যা তথ্যের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে তা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করে না।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হয়েও বাংলাকে মনে-প্রাণে ধারণ করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তায় বাংলা ভাষা ও মানুষের জীবন গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অথচ আমাদের মধ্যেই একটি অংশ তাঁকে এমন এক অভিযোগের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করতে চায়, যার ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়। তাঁদের ধারণা, রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ভালো চাননি। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তাঁর জীবন, সাহিত্য, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সমসাময়িক ইতিহাসকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা প্রয়োজন।
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁর সাহিত্য নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনাও করা যেতে পারে। কিন্তু তাঁকে অস্বীকার করার জন্য যদি মিথ্যা ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়, তাহলে সেই অস্বীকৃতি শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের ইতিহাসবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রবীন্দ্রনাথ আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁকে ঘিরে বিতর্ক, বিদ্বেষ কিংবা ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে নিজেদেরই চিন্তাভাবনা ও সাংস্কৃতিক অবস্থান প্রকাশ করি। তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাঁর বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষের জবাবে কী লিখতেন?
আসলে এর জবাব তিনি অনেক আগেই লিখে গেছেন—
কেউ বা তোমায় ভালোবাসে,
কেউ বা বাসতে পারে না যে,
কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা
সিকি পয়সা ধারে না যে,
………।
মনেরে আজ কহ যে,
ভালো-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে।
আরো পড়ুন : জিন্নাহকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক পাঠ