চোখের দেখার বাইরে অনুভবের জগৎ আরিফ আব্দুল্লাহর 

আলোকচিত্রী আরিফ আব্দুল্লাহর ‘লিসেনিং বিয়ন্ড সাইট’ একক প্রদর্শনীর আলোকচিত্র।

ঢাকার অলিয়ঁস ফ্রঁসেসে চলছে আলোকচিত্রী আরিফ আব্দুল্লাহর একক প্রদর্শনী “লিসেনিং বিয়ন্ড সাইট”। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগরজীবন, নদী, শ্রম, শৈশব এবং নিঃসঙ্গতার নানা মুহূর্ত উঠে এসেছে তাঁর ছবিতে। সাদাকালো আলোকচিত্রের প্রাধান্যে সাজানো এই প্রদর্শনী দর্শককে দৃশ্যের বাইরের অনুভূতি ও জীবনের গভীরতা উপলব্ধির আহ্বান জানায়।

১৬ অক্টোবর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে প্রধানত সাদাকালো রৌপ্য-জেলাটিন পদ্ধতিতে তৈরি আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একটি রঙিন ছবিও।

“লিসেনিং বিয়ন্ড সাইট” — প্রদর্শনীর নামেই রয়েছে এর মূল ভাবনা।  আরিফ আব্দুল্লাহর স্টেটমেন্টে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে দৃশ্য কেবল চোখের বিষয় নয়; দৃশ্য কান দিয়ে, নাক দিয়ে, হাতের স্পর্শ দিয়ে, এমনকি জিহ্বার স্বাদ দিয়েও “দেখা” যায়। এই বহু-ইন্দ্রিয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি এমন একটি ফটোগ্রাফিক ভাষা তৈরি করেছেন যা দেখতে গিয়েও শোনায়, স্পর্শ করে, গন্ধ অনুভব করে।  এই ভাবনা তাঁর আলোকচিত্রের বিষয় নির্বাচন ও উপস্থাপনায় প্রতিফলিত হয়েছে। ছবিগুলোতে কেবল কোনো ব্যক্তি, স্থান কিংবা ঘটনার দৃশ্যমান রূপ তুলে ধরা হয়নি। বরং পরিচিত দৃশ্যের মধ্য দিয়ে জীবনের অনুভূতি, স্মৃতি ও নীরবতার ভাষা খোঁজার চেষ্টা রয়েছে।

বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের জীবন তাঁর ছবির প্রধান উপাদান। তবে উপস্থাপনার ধরন নিছক তথ্যনির্ভর আলোকচিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আলো, ছায়া, কাঠামো ও দৃশ্যের বিন্যাসে ছবিগুলো পেয়েছে কাব্যিক মাত্রা।

প্রদর্শনীর প্রায় সব কাজই সাদাকালো — একটি সচেতন নান্দনিক পছন্দ। সাদাকালো ফটোগ্রাফি রঙের বিভ্রান্তি সরিয়ে দেয়, ফলে দর্শক আকার, আলো-ছায়া, টেক্সচার ও আবেগের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে একটি মাত্র রঙিন কাজ — বাঁশের খাঁচায় দুটি মুরগির ছবি — চোখে পড়ার মতো ব্যতিক্রম। এই রঙিন কাজটি যেন প্রদর্শনীর মাঝখানে একটি বিরতি, একটি সতর্কতা যে রঙও দেখার একটি ভাষা, কিন্তু শিল্পী ইচ্ছাকৃতভাবে তা সংযত রেখেছেন।

আরিফের কাজে আলো-ছায়ার ব্যবহার লক্ষণীয়। গাছের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়া রশ্মি, কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় দুজনের সিলুয়েট, নদী তীরে ঘুমানো মানুষের জানালায় প্রতিফলিত আলো — এই ছবিগুলোতে আলো কেবল আলোকসজ্জা নয়, বরং আবেগের বাহক। ছবির কাঠামো তৈরিতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কোথাও ট্রেনের জানালা, কোথাও নৌকার কিনারা, আবার কোথাও দেয়ালের অংশ দৃশ্যের ভেতরে আরেকটি দৃশ্য তৈরি করেছে। নদীর পটভূমিতে রাখা একটি খালি চেয়ারের ছবিতেও অনুপস্থিতির অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রদর্শনীর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নদী, নৌকা, জেলে, ঘাট। বাংলাদেশের নদীমাতৃক পরিচয় এখানে কেবল ভৌগোলিক নয়, দার্শনিক। নদী এখানে প্রবাহ, পরিবর্তন, জীবন ও মৃত্যুর প্রতীক। কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া নৌকার দৃশ্য সেই অনিশ্চয়তাকে সামনে আনে। নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার বিভিন্ন মুহূর্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কও ফুটে উঠেছে।

শ্রমিকের ক্লান্ত মুখ, মাথায় বোঝা বহন করা মানুষ, নাপিতের দোকান, রান্নার ধোঁয়া — এই ছবিগুলোতে শরীর কেবল শরীর নয়, শ্রমের ইতিহাস। মাথায় বোঝা বহন করা এক শ্রমিকের প্রতিকৃতিতে তাঁর ক্লান্ত মুখ ও সরাসরি তাকিয়ে থাকার ভঙ্গি দৃশ্যটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ঘাম, শরীরের অভিব্যক্তি ও শ্রমের চিহ্নের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনসংগ্রামের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

একাধিক ছবিতে শিশু — জেটিতে দাঁড়িয়ে, রাস্তায়, জানালায়। এই শিশুরা কেবল শিশু নয়, তারা এক ধরনের প্রতীক্ষার প্রতীক। ছোট মেয়ের প্রতিকৃতি যেখানে সে সরাসরি দর্শকের দিকে তাকাচ্ছে — তার এই দৃষ্টিতে আছে প্রশ্ন, আছে অভিযোগ, আছে নিঃশব্দ আবেদন।

অন্যদিকে, খালি চেয়ার, ঘুমন্ত মানুষ কিংবা পেছন ফিরে থাকা ব্যক্তিদের ছবিতে উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির সম্পর্ক উঠে এসেছে। এসব দৃশ্যের মধ্য দিয়ে শিল্পী এমন কিছু অনুভূতির দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, যা সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ।

মাছের মুখের কাছ থেকে তোলা ছবি, শুকনো ডালপালার জট এবং মরিচা ধরা টিনের ছাদের মতো বিষয়েও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। এসব ছবিতে টেক্সচার এতটাই প্রকট যে দর্শকের মনে সেগুলো স্পর্শ করে দেখার অনুভূতিও তৈরি করতে পারে।

প্রদর্শনীর ছবিগুলো একই ধরনের কাঠের ফ্রেম ও হালকা রঙের সীমানা দিয়ে সাজানো হয়েছে। বড় ও ছোট ছবির পাশাপাশি উল্লম্ব ও অনুভূমিক ছবির বিন্যাসেও বৈচিত্র্য রয়েছে। এতে প্রদর্শনীর সামগ্রিক উপস্থাপনায় একটি সামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

আরিফ আব্দুল্লাহর কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বাস্তব জীবনের দৃশ্য ধারণ করেও তিনি কেবল তথ্য উপস্থাপনে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁর ছবিতে দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত বিষয়গুলো নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যই প্রদর্শনীটিকে কেবল ছবির সমাহার হিসেবে না দেখে দেখার ধরন নিয়ে একটি শিল্পীসুলভ অনুসন্ধান হিসেবে বিবেচনার সুযোগ দেয়।

২০ অক্টোবর পর্যন্ত চলা “লিসেনিং বিয়ন্ড সাইট” কেবল একটি ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী নয় — এটি দেখার দর্শন নিয়ে একটি চিন্তা। আরিফ আব্দুল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে দেখা কেবল চোখের কাজ নয়; এটি মনের কাজ, হৃদয়ের কাজ, স্মৃতির কাজ। তার ছবিগুলো বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মুখ দেখায়, কিন্তু সেই মুখের পেছনে আছে সার্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতা — শ্রম, প্রতীক্ষা, নিঃসঙ্গতা, সৌন্দর্য, ক্ষয়।

প্রদর্শনীটি দর্শককে আহ্বান জানায়: চোখ বন্ধ করো, তারপর দেখো।

 

 

আরো পড়ুন : এক ঘাটে জীবনের কত গল্প, দেখালেন ৫৯ জন আলোকচিত্রী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *