অপারেশন জ্যাকপটের বীরত্ব স্মরণে ঢাকায় স্মরণসভা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নৌ-কমান্ডোদের ঐতিহাসিক অপারেশন জ্যাকপটের বীরত্ব স্মরণে ঢাকায় স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন ও ডুবে যাওয়া জাহাজ অপসারণের সময় প্রাণ হারানো সোভিয়েত নাবিক ইউরি রেডকিনকেও স্মরণ করা হয়।

রোববার ঢাকায় এ স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্মৃতি একাত্তর ও রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকা। এতে সহযোগিতা করে ১৯৭১ আওয়ার প্রাইড। অনুষ্ঠানে অপারেশন জ্যাকপটে অংশ নেওয়া নৌ-কমান্ডো, মুক্তিযোদ্ধা, অতিথি ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকার পরিচালক আলেক্সান্দ্রা খ্লেভনয় বক্তব্য দেন। তিনি অপারেশন জ্যাকপটে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি নৌ-কমান্ডোদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার গুরুত্বও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বের ইতিহাসকে আরও শক্তিশালী করে। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার জনগণের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিনের পক্ষে অনুষ্ঠানে একটি বিশেষ বক্তব্য পাঠ করা হয়। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে ঝুঁকিপূর্ণ মাইন অপসারণ অভিযানে অংশ নেওয়া সোভিয়েত নাবিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।

অপারেশন জ্যাকপট ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুঃসাহসিক নৌ-অভিযান। ১৯৭১ সালের ১৫ ও ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে অভিযান চালান বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা।

অভিযানের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করা। একই সঙ্গে বন্দরগুলোতে অবস্থানরত পাকিস্তানি ও বিদেশি জাহাজে আঘাত হানা ছিল অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।

নৌ-কমান্ডোরা অত্যন্ত গোপনে এসব অভিযানে অংশ নেন। তাঁরা জাহাজের গায়ে লিমপেট মাইন স্থাপন করেন। বিস্ফোরণে একাধিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত ও ডুবে যায়। এতে বাংলাদেশের বন্দরগুলো দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র, রসদ ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

অপারেশন জ্যাকপট মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এটি প্রমাণ করে, প্রশিক্ষণ ও সীমিত সরঞ্জাম নিয়েও মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানতে সক্ষম ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বন্দরের পানিতে মাইন ও ডুবে থাকা জাহাজের কারণে নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

স্বাধীন বাংলাদেশের বন্দর সচল করতে সোভিয়েত নৌবাহিনীর একটি দল মাইন অপসারণ ও ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের কাজে অংশ নেয়। এ অভিযানে অংশ নেওয়া সোভিয়েত নাবিকদের একজন ছিলেন ইউরি রেডকিন।

১৯৭৩ সালের ১৩ই  জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন অপসারণ ও উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার সময় রেডকিন প্রাণ হারান। তাঁর আত্মত্যাগ বাংলাদেশ-সোভিয়েত সহযোগিতার ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

স্মরণসভায় তাঁর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে তাঁর আত্মত্যাগের ওপর একটি মরণোত্তর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

অনুষ্ঠানে অপারেশন জ্যাকপট ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণদের স্মারক ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

সম্মাননা পাওয়াদের মধ্যে ছিলেন এ ডব্লিউ চৌধুরী, আবিদুর রহমান, সৈয়দ আহমেদ মজুমদার, প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান, আবদুল গফুর ও মোমিন উল্লাহ পাটোয়ারী।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে অপারেশন জ্যাকপটের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

এ ছাড়া অপারেশন জ্যাকপটে ব্যবহৃত গোপন সংকেতের সঙ্গে সম্পর্কিত গান পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অপারেশন জ্যাকপটে অংশ নেওয়া প্রবীণদের সঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তারা বলেন, অপারেশন জ্যাকপট শুধু একটি সামরিক অভিযান ছিল না। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির সাহস, কৌশল ও আত্মত্যাগের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এই ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *