মহানগরে একাকীত্ব: সম্পর্ক ভাঙলে কেন কারও কাছে পৃথিবীটা ছোট হয়ে যায়

ঢাকার একটি ছোট ফ্ল্যাটে একজন তরুণ একা থাকেন। সারাদিন ফোনে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আছে—মেসেজ, ভিডিও কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অথচ গভীর রাতে যখন কোনো সম্পর্ক ভেঙে যায়, কোনো প্রিয় মানুষ দূরে সরে যায় কিংবা জীবনের কোনো সংকট সামনে আসে, তখন হয়তো পাশে বসে কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া যায় না।

এই দৃশ্যটি কল্পিত হলেও এর সামাজিক বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

মহানগর জীবনে একা থাকা এখন আর বিরল ঘটনা নয়। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কারণে বহু তরুণ পরিবার থেকে দূরে থাকেন। তাদের যোগাযোগের বড় অংশ চলে গেছে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু অনলাইনে সংযুক্ত থাকা আর সামাজিকভাবে নিরাপদ থাকা—দুটি এক জিনিস নয়।

আর এখানেই একাকীত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একা থাকা আর একাকীত্ব এক নয়

একজন মানুষ একা একটি বাসায় থাকেন—এটি একটি বসবাসের পরিস্থিতি। কিন্তু তিনি একাকী বোধ করছেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।

কেউ একা থাকলেও পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক রাখতে পারেন। আবার মানুষের ভিড়ের মধ্যেও কেউ গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন।

গবেষণায় একাকীত্বকে সাধারণত মানুষের প্রত্যাশিত সামাজিক সম্পর্ক এবং বাস্তবে পাওয়া সম্পর্কের মধ্যে একটি বেদনাদায়ক ব্যবধান হিসেবে দেখা হয়।

২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ-তে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের একাকীত্বর সঙ্গে পাড়ার সংহতি, সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ একাকীত্বকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না।

সম্পর্ক ভাঙা কেন এত বড় সংকট হতে পারে?

প্রেমের সম্পর্ক মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ আবেগীয় নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে। ফলে সেই সম্পর্কের ভাঙন কারও জন্য গভীর মানসিক আঘাত হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে।

ব্রেকআপ বা ঝগড়াকে আত্মহত্যার সরল কারণ হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।

ডব্লিউএইচও বলছে, আত্মহত্যা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ঘটনা। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ, সম্পর্কের সংকট, জীবনের বড় পরিবর্তনসহ একাধিক বিষয় যুক্ত থাকতে পারে।

একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া তাই কারও আত্মহত্যার একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবেও ঠিক নয়।

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—সেই সংকটের মুহূর্তে মানুষটির পাশে আর কী কী সামাজিক ও মানসিক সহায়তা ছিল?

একাকীত্বের সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্ক আছে কি?

আছে—এবং এ বিষয়ে গবেষণার ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী।

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা এনালিসিস-এ একাকীত্ব পরবর্তী আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মঘাতী আচরণ-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীকারী হিসেবে পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে এবং আরও গবেষণার প্রয়োজন।

২০২৩ সালের আরেকটি সিস্টেমেটিক রিভিউ-তেও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব-এর সঙ্গে আত্মহত্যার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ একাকীত্বকে আত্মহত্যার সরাসরি কারণ বলা যাবে না; কিন্তু একজন মানুষের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বকে উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।

ভার্চুয়াল সংযোগ কি বাস্তব সংযোগের বিকল্প?

এটি আজকের প্রজন্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একজন তরুণের ফোনে শত শত নাম্বার থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকতে পারে হাজারো অনুসারী। প্রতিদিন অসংখ্য মেসেজ আসতে পারে।

তবু সংকটের মুহূর্তে তার পাশে বসে কথা বলার মতো মানুষ নাও থাকতে পারেন।

এখানে প্রযুক্তি নিজে সমস্যার কারণ—এমন সিদ্ধান্তও অতিরঞ্জিত হবে। প্রযুক্তি মানুষকে যোগাযোগের নতুন সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু অনলাইন যোগাযোগ সবসময় বাস্তব সামাজিক অঙ্গীভূত-এর বিকল্প হয় না।

তাই “সবসময় অনলাইনে থাকা” এবং “সামাজিকভাবে সংযুক্ত থাকা”—এই দুই ধারণাকে এক করে দেখা উচিত নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশে আত্মহত্যার সঠিক ও নিয়মিত জাতীয় পরিসংখ্যান পাওয়া একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। ফলে নির্দিষ্ট কোনো একটি সংখ্যা ব্যবহার করার আগে তার সংজ্ঞা, বছর এবং উৎস পরীক্ষা করা জরুরি।

ডব্লিউএইচও-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি ডাটা-তে আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার-এর একটি অনুমান ৩.০৮ প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ডব্লিউএইচও-এর বাংলাদেশ মেন্টাল হেলথ কান্ট্রি রিপোর্ট -এ গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ-এর হিসাব ব্যবহার করে ২০১৮-১৯ সময়ের জন্য প্রায় ৯,৩৪৩ আত্মহত্যায় মৃত্যুর হিসাবও দেওয়া হয়েছিল।

এই পরিসংখ্যানগুলো থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—আত্মহত্যা বাংলাদেশেও গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

তবে বাংলাদেশে মহানগরে একা থাকা তরুণদের আত্মহত্যার হার অন্যদের তুলনায় বেশি—এমন নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান এখনই দাবি করা উচিত নয়।

কারণ সেই দাবির জন্য বয়স, বসবাসের ধরন, শহর ও গ্রাম, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মহত্যার ঘটনাগুলোকে একই ডাটাসেট-এ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রথম কাজ হলো সংকটকে একা বহন না করা।

একজন তরুণ যদি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর, চাকরি হারানোর পর, পারিবারিক সংকটে বা অন্য কোনো বড় আঘাতের পর নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন, তাহলে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক, স্থানীয় সম্প্রদায় বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা—এসবই একটি মানুষকে শক্তিশালী করতে পারে।

বিশেষ করে মহানগরে একা থাকা তরুণদের জন্য এমন সামাজিক পরিসর দরকার যেখানে তারা শুধু অনলাইনে নয়, বাস্তব জীবনেও মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

কারণ মানুষ শুধু যোগাযোগ চায় না; মানুষ অনুষঙ্গও চায়।

আত্মহত্যার সংবাদে সাংবাদিকতার দায়িত্ব

এই জায়গাটিই সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো আত্মহত্যার ঘটনা সংবাদযোগ্য হতে পারে। কিন্তু সেই সংবাদ কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন।

ডব্লিউএইচও-র ২০২৩ সালের মিডিয়া গাইডলাইন বলছে, আত্মহত্যার সংবাদে চাঞ্চল্যকর ভাষা, অতিরিক্ত বিশিষ্টতা, আত্মহত্যাকে কোনো সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন, পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ কিংবা ঘটনার নির্দিষ্ট স্থান প্রকাশ এড়িয়ে চলা উচিত।

ডব্লিউএইচও বাংলাদেশও সাংবাদিকদের একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে—আত্মহত্যার পদ্ধতি বর্ণনা না করা, চাঞ্চল্যকর শিরোনাম এড়িয়ে চলা, ঘটনার স্থান নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিবরণ না দেওয়া এবং সহায়তা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ-এর তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া।

কারণ সংবাদ শুধু তথ্য পরিবেশন করে না; সংবাদ মানুষের চিন্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

ডব্লিউএইচও-এর মতে, বিশেষ করে ব্যাপক, চাঞ্চল্যকর বা পদ্ধতিবিষয়ক আত্মহত্যা কভারেজ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের মধ্যে অনুকরণ-এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিপরীতে পুনরুদ্ধার, সহনশীলতা এবং সাহায্য প্রার্থনা-এর গল্প ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকজন মানুষকে দেখার দায়িত্ব

মহানগরের একাকীত্বের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হয়তো এই নয় যে মানুষ একা থাকে।

বরং ভয়াবহ দিক হলো—কেউ একা হয়ে গেলেও আমরা সেটা বুঝতে পারি না।

একজন মানুষ প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকতে পারেন, নিয়মিত ছবি দিতে পারেন, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন—তারপরও ভেতরে গভীর সংকটে থাকতে পারেন।

তাই সংকটের মুহূর্তে “কী হয়েছে?” প্রশ্নটির গুরুত্ব অনেক।

কারও আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন দেখা গেলে, সে নিজেকে গুটিয়ে নিলে কিংবা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ তৈরি হলে তাকে একা না রেখে পরিবার, বিশ্বস্ত বন্ধু বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।

আত্মহত্যা কোনো একটি ঘটনা, একটি সম্পর্ক কিংবা একটি রাতের সরল পরিণতি নয়। এর পেছনে বহুস্তরীয় কারণ থাকতে পারে।

তাই আমাদের কাজও একমাত্রিক হতে পারে না।

মহানগরের তরুণদের শুধু “শক্ত হতে হবে” বললে হবে না। তাদের এমন সম্পর্ক, পরিবার, বন্ধুত্ব ও কমিউনিটি দরকার যেখানে সংকটের সময় তারা বলতে পারেন—“আমি ভালো নেই।”

আর সেই কথাটি বলার পর যেন কেউ উত্তর দেয়—

“আমি আছি। কথা বলি।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *