ঐতিহাসিক জাহাজমারা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালনের দাবি জানানো হয়েছে।
১১ই আগস্ট, ২৭ শ্রাবণ ঐতিহাসিক জাহাজমারা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে ফাতেমা ল কলেজ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদের সভাপতি গোলাম মোস্তফা তাপোসের সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন ডা. মআআ মুক্তাদীর।
সভায় বক্তব্য দেন সংসদের উপদেষ্টা অধ্যক্ষ লুৎফুল আহসান বাবু, কবি মতিয়ারা চৌধুরী মিনু, রিয়াদ মাহমুদ খান, ফারজানা রাখিসহ অন্যরা।
বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জাহাজমারা যুদ্ধ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখযুদ্ধ। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের একটি বড় পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আসে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১১ই আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি ও রসদবাহী সাতটি জাহাজ নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল। জাহাজগুলো টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের মাটিকাটা-সিরাজকান্দি এলাকায় পৌঁছালে কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা সেগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করে অবস্থান নেন।
কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দুটি বড় জাহাজকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালান। জাহাজ দুটির নাম ছিল ‘এস ইউ ইঞ্জিনিয়ার্স এলসি-৩’ ও ‘এসটি রাজন’। আক্রমণের একপর্যায়ে জাহাজ দুটি আটকে পড়ে। পরে মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ দুটির নিয়ন্ত্রণ নেন।
যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় ঘণ্টায় কয়েক শ অস্ত্র ও গোলাবারুদের বাক্স জাহাজ থেকে নামানো হয়। উদ্ধার করা অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জাহাজমারা যুদ্ধের গুরুত্ব শুধু অস্ত্র উদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উত্তরবঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের পরিকল্পনাও এতে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ কারণে যুদ্ধটিকে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, জাহাজমারা যুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস এখনো সাধারণ মানুষের কাছে যথেষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় জনগণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা জরুরি।
তারা বলেন, জাহাজমারা যুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ যুদ্ধের স্থান, স্মৃতিচিহ্ন ও সংশ্লিষ্ট দলিল সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে নিয়মিত কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, জাহাজমারা দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় পালনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ দাবিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও দেশপ্রেমিক জনগণকে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।
জাহাজমারা যুদ্ধের স্মৃতি আজও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের মাটিকাটা ও সিরাজকান্দি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে আছে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই যুদ্ধের সামরিক ও কৌশলগত তাৎপর্য নিয়ে আরও গভীর গবেষণা হলে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে।