‘সবকিছু দিয়ে দিয়েছি, আমার আর কিছু দেওয়ার নেই’—আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোলের পর বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি
লিওনেল মেসি আর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন না। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। ৩১শে আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাতে লেখা একটি চিঠির ছবি প্রকাশ করে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২১ বছরের পথচলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর তিনি খেলেছেন ২০৭ ম্যাচ। করেছেন ১২৫ গোল। দুটিই আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারে আর্জেন্টিনা। ১৯শে জুলাই নিউইয়র্ক-নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের পরই মেসি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন।
তবে তখনই তা প্রকাশ করেননি। নিজের বিদায়বার্তায় মেসি জানান, চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন ফাইনালের দুই দিন পর, ২১শে জুলাই। এরপর বাবা জর্জ মেসির মৃত্যুর পর সিদ্ধান্তটি আরও দৃঢ় হয়।
জর্জ মেসি ৮ই আগস্ট ৬৮ বছর বয়সে রোজারিওতে মারা যান। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি। লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে বাবার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকে তিনি ছেলের ক্যারিয়ার পরিচালনা করেছেন। বার্সেলোনায় মেসির যাত্রার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মেসির বিদায়বার্তায় তাই ফুটবলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত শোকের ছাপও স্পষ্ট।
মেসি লিখেছেন, জাতীয় দলের হয়ে তিনি সবসময় সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। শুধু সাম্প্রতিক সাফল্যের সময় নয়, কঠিন সময়েও তিনি আর্জেন্টিনার জন্য লড়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে খেলা তার কাছে সবসময় গর্বের বিষয় ছিল। কিন্তু এখন মনে করছেন, একটি অধ্যায় শেষ করার সময় এসেছে।
তার ভাষায়, তিনি নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দেরও সুযোগ পাওয়ার সময় এসেছে।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শুরুটা সহজ ছিল না। বড় টুর্নামেন্টে একের পর এক ব্যর্থতা তাকে দীর্ঘদিন সমালোচনার মুখে রেখেছিল।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারে আর্জেন্টিনা। ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও চিলির কাছে হেরে যায় দলটি।
২০১৬ সালের পর মেসি প্রথমবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে সেই সিদ্ধান্ত স্থায়ী হয়নি। তিনি ফিরে আসেন জাতীয় দলে।
এরপর বদলে যায় গল্প।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের বড় শিরোপা-খরা কাটে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জেতে দলটি। এর সঙ্গে ২০২২ সালের ফাইনালিসিমা শিরোপাও যোগ হয়।
মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—প্রতিটি আসরেই তিনি ইতিহাসের অংশ হয়েছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল তার শেষ অধ্যায়। স্পেনের কাছে ফাইনালে হারলেও পুরো টুর্নামেন্টে মেসির পারফরম্যান্স ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজে আটটি গোল করেন ও চারটি গোলে অ্যাসিস্ট করেন।
বিশ্বকাপে মেসির মোট ম্যাচ ৩৪টি। এটিও সর্বকালের রেকর্ড। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার কৃতিত্বও তাকে বিশেষ জায়গায় রেখেছে।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পরিসংখ্যানই তার ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি বোঝাতে যথেষ্ট।
- ম্যাচ: ২০৭
- গোল: ১২৫
- অ্যাসিস্ট: ৬৮
- বিশ্বকাপ: ৬টি
- বিশ্বকাপ ম্যাচ: ৩৪
- বিশ্বকাপ গোল: ২১
- বিশ্বকাপ শিরোপা: ২০২২
- কোপা আমেরিকা: ২০২১ ও ২০২৪
- ফাইনালিসিমা: ২০২২
- অলিম্পিক স্বর্ণ: ২০০৮
আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেছেন মেসি।
মেসির অবসর মানে ফুটবল থেকে অবসর নয়। তিনি এখনো মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তার চুক্তি ২০২৮ সালের MLS মৌসুম পর্যন্ত।
জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর মাত্র দুই দিন আগে, ২৯শে আগস্ট, মন্ট্রিয়েলের বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির ৭-১ গোলের জয়ে চার গোল করেন মেসি। ম্যাচটিতে তার পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে গেলেও ক্লাব পর্যায়ে তার সামর্থ্য এখনো অটুট।
মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক একসময় ছিল হতাশা ও সমালোচনায় ভরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক বদলে যায় বিশ্বকাপের সোনালি স্মৃতিতে।
তিনি জাতীয় দলকে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ এবং আরও অনেক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিনিময়ে পেয়েছেন কোটি মানুষের ভালোবাসা।
তার বিদায়বার্তার শেষ কথাগুলো তাই কেবল একজন ফুটবলারের অবসর ঘোষণা নয়। এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তি।
মেসি লিখেছেন, সতীর্থদের সঙ্গে এমন কিছু মুহূর্ত তিনি আর্জেন্টাইনদের উপহার দিতে পেরেছেন, যা একসময় ছিল কেবল স্বপ্ন। এরপর তিনি লিখেছেন—‘ধন্যবাদ, ঈশ্বর, আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য। এগিয়ে চলো, আর্জেন্টিনা।’
২১ বছর পর আর্জেন্টিনার জার্সি তুলে রাখলেন মেসি। এবার তিনি থাকবেন গ্যালারির অন্য পাশে—নিজের দেশের খেলোয়ার হয়ে নয়, নিজের দেশের একজন সমর্থক হিসেবে।