সিলেটে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সংস্কার প্রয়োজন
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সামাজিক বৈষম্য দূর করা এবং ভবিষ্যতে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সিলেটে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, একটি বৈষম্যহীন, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মঙ্গলবার (১লা সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে সিলেট জেলা বিএনপি এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভবিষ্যতে যাতে কোনো সামরিক স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ বা অন্য কোনো অপশক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, সে জন্য সংবিধানের বিভিন্ন ধারা ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে সংস্কারের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কাঠামো এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত থাকে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১/১১-এর পর দেশের গণতন্ত্র গভীর সংকটে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে তা ফ্যাসিবাদে রূপ নেয়—এমন দাবি বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ। তাঁর ভাষায়, ছাত্র-জনতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের আন্দোলন এবং প্রাণহানির মধ্য দিয়ে দেশ আবার স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটিকে ভিত্তি করে একটি আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইমাম, মুয়াজ্জিন, বিভিন্ন ধর্মের পুরোহিত এবং উপাসনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, রাষ্ট্রের সব নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক বৈষম্য কমানো ছাড়া একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রজীবনেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
তিনি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরে বলেন, দলটির ১৯ দফা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক সমৃদ্ধি।
মুক্তাদির ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। পাশাপাশি নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্র ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি উল্লেখ করেন।
নারী শিক্ষার প্রসার, যুবকদের কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারেও বিএনপির ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ‘উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি’ অনুসরণ করে দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় দেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, কৃষি, শিল্প, খাদ্য উৎপাদন ও পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমান সরকারের সামনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার কাজ করবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির প্রায় অর্ধশতকের রাজনৈতিক ইতিহাসকে আন্দোলন, সংগ্রাম, অর্জন ও পরিবর্তনের ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশবাসী এবং সিলেট জেলা ও মহানগরের দলীয় নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানান।
একই সঙ্গে গণতন্ত্রের চর্চা, সামাজিক বৈষম্য দূর করা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দেশের নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোহাম্মদ আব্দুল মালিক এমপি ও ড. এনামুল হক চৌধুরী, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সহ-ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী ও আবুল কাহের চৌধুরীসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।