ব্যাটারিচালিত রিকশা: উচ্ছেদ নয়, দরকার নিরাপদ ও কার্যকর পরিবহননীতির

ঢাকার সড়কে চলাচলরত ব্যাটারিচালিত রিকশা

ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিক্য নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসেছে। একদিকে যানজট, দুর্ঘটনা, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও অবৈধ চার্জিং নিয়ে উদ্বেগ; অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা, স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াত এবং সাশ্রয়ী পরিবহনের প্রয়োজন।

এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি আসলে ‘রিকশা থাকবে কি থাকবে না’—এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কোন ধরনের রিকশা, কোন রুটে, কত সংখ্যায়, কী নিরাপত্তা মানে এবং কার জবাবদিহির অধীনে চলবে।

সরকারও এখন সরাসরি উচ্ছেদের বদলে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। ৩০শে আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশা চলতে দেওয়া হবে না। তবে অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোকে আটটি জোনে ভাগ করে সেখানে নিবন্ধিত যান চলাচলের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বোচ্চ চার যাত্রী বহনকারী যানকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।

সরকারের প্রস্তাবিত কাঠামোয় শুধু রাস্তায় চলাচল নয়, যানবাহনের কারিগরি মান, ফিটনেস, নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, উৎপাদন এবং চার্জিং ব্যবস্থাকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এর আগে আগস্টেই সরকার শহর করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল।

অর্থাৎ বর্তমান সরকারি অবস্থানকে শুধু ‘রিকশা উচ্ছেদ’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। বরং মূল সড়ক থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় নিবন্ধিত, পরীক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত যান চালানোর একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।

রিকশা এত দ্রুত বাড়ল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান কঠিন।

ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো শূন্যস্থান থেকে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বেকার বা অল্প দক্ষ শ্রমশক্তি, তুলনামূলক কম পুঁজিতে পরিবহন ব্যবসায় প্রবেশের সুযোগ, যাত্রীদের সাশ্রয়ী পরিবহনের চাহিদা, গ্যারেজ ও চার্জিং অবকাঠামো এবং স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

সরকার নিজেও এখন উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার দিকটি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে। প্রস্তাবিত নীতিতে অনুমোদিত বা মানসম্মত মডেল উৎপাদন এবং অননুমোদিত উৎপাদন, চার্জিং ও পার্কিং নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এসেছে।

ফলে শুধু চালককে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশ অক্ষত থেকে যেতে পারে। আবার চালকের জীবিকার কথা বলে যানটির নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনার সমস্যা উপেক্ষা করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।

ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো বিদ্যুৎ ব্যবহার। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশে এসব যানবাহনের সংখ্যা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় বড় হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও দৈনিক ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।

তবে এখানে একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

‘দৈনিক ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার’—এ ধরনের বক্তব্য একটু সতর্কভাবে দেখা দরকার। কারণ মেগাওয়াট (MW) দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ নয়, মূলত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা বা চাপ বোঝানো হয়।

সহজ করে বললে, একটি গাড়ি ঘণ্টায় কত কিলোমিটার গতিতে চলছে আর এক দিনে মোট কত কিলোমিটার পথ চলেছে—এই দুটো এক বিষয় নয়। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কোনো একটি সময়ে কতটা বিদ্যুৎ প্রয়োজন হচ্ছে, আর সারাদিনে মোট কত বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে, দুটি আলাদা হিসাব।

তাই ‘প্রতিদিন ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে’ বললে আগে জানতে হবে—এই ৮০০ মেগাওয়াট দিয়ে আসলে কী বোঝানো হয়েছে এবং হিসাবটি কীভাবে করা হয়েছে। সারাদিনে মোট কত বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে, সেটি সাধারণত কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) বা মেগাওয়াট-ঘণ্টা (MWh) দিয়ে প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ ৮০০ মেগাওয়াটের সংখ্যাটি ঠিক কি বোঝাচ্ছে, তা পরিষ্কার না করে সেটাকে ‘দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ’ হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে চার্জিংয়ের সমস্যা নেই।

অননুমোদিত চার্জিং, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, স্থানীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর চাপ এবং পুরোনো বা নিম্নমানের ব্যাটারি ও চার্জারের ব্যবহার বাস্তব নীতিগত উদ্বেগ। সরকারও চার্জিং ব্যবস্থাকে লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে।

অতএব সমস্যাটি শুধু ‘রিকশার ব্যাটারি’ নয়। সমস্যাটি হলো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনার সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ।

ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে বিতর্কে ব্যক্তিগত গাড়ি, এসি কিংবা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে তুলনা টানা হয়।

একটি এসি কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং একটি রিকশা কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে—এই হিসাব করা সম্ভব। কিন্তু শুধু বিদ্যুৎ খরচ দিয়ে কোনটি প্রয়োজনীয় আর কোনটি অপ্রয়োজনীয়, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

পরিবহন একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একটি রিকশার বিদ্যুৎ খরচের বিনিময়ে কত যাত্রী পরিবহন হচ্ছে, কত মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে এবং স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে কতটা সুবিধা তৈরি হচ্ছে—সেটিও হিসাবের অংশ হওয়া উচিত।

কিন্তু উল্টো যুক্তিটিও সমানভাবে সত্য। ‘গরিব মানুষ ব্যবহার করে’—এই কারণে কোনো যান স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ বা বৈধ হয়ে যায় না। একজন দরিদ্র চালক ঝুঁকিপূর্ণ যান চালালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যায় না। পথচারী, বাসযাত্রী, মোটরসাইকেল আরোহী এবং অন্য চালকদের নিরাপত্তার অধিকারও সমান।

তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রশ্নে শ্রেণিগত তুলনার বদলে প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য তথ্য ও অভিন্ন নীতি।

ঢাকার রাস্তা সীমিত। একই সড়কে বাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, পণ্যবাহী যান, রিকশা এবং পথচারী চলাচল করেন।

কোনো যানবাহনকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যেকোনো জায়গায় চলার সুযোগ দিলে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার রাস্তার বড় অংশ শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য রেখে নিম্ন আয়ের মানুষের পরিবহনকে পুরোপুরি বাদ দেওয়াও কার্যকর নগর পরিবহননীতি হতে পারে না।

এখানেই সরকারের আট জোনের পরিকল্পনা একটি সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করতে পারে। কিন্তু জোন তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

কোন সড়কে কত যান চলবে, কোন সময়ে চলবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে, কোন যান কোন রুটে যাবে এবং জোনগুলোর মধ্যে যাত্রী কীভাবে স্থানান্তর করবে—এসবের বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জোনভিত্তিক ব্যবস্থা সফল করতে হলে একই সঙ্গে নিরাপদ বিকল্প রুট ও পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় মূল সড়ক থেকে রিকশা সরিয়ে শুধু গলিতে যানজট স্থানান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

ব্যাটারিচালিত রিকশার একটি বড় সমস্যা হলো অনানুষ্ঠানিকতা। নিবন্ধন নেই, মানসম্মত নকশা নেই, চালকের প্রশিক্ষণ নেই কিংবা ফিটনেস যাচাই নেই—এমন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ হতে পারে না।

সরকারের প্রস্তাবিত নীতিতে তাই নিবন্ধন, কারিগরি সনদ, ফিটনেস, চালকের লাইসেন্স এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের লাইসেন্সিংয়ের কথা এসেছে। সরকারি নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালেই সিটি করপোরেশন এলাকায় স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে বিধিমালা জারি হয়েছিল এবং ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্সের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন সম্ভব।

বর্তমানে প্রশ্নটি হচ্ছে—এই রিকশা চলবে কি চলবে না?

ভবিষ্যতের প্রশ্ন হওয়া উচিত— কোন মানের রিকশা, কোন চালক, কোন রুটে, কত সংখ্যায় এবং কোন শর্তে চলতে পারবে?’

এটি নিষেধাজ্ঞার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো হতে পারে।

ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মালিকানা।

অনেক ক্ষেত্রে চালক দৈনিক জমা দেন এবং দুর্ঘটনা, মামলা, পুলিশি হয়রানি ও আয়ের অনিশ্চয়তার ঝুঁকি বহন করেন। অন্যদিকে যানটির মালিক নিয়মিত আয় পান।

এই কাঠামো যদি বাস্তবে বিদ্যমান থাকে, তাহলে নীতিমালায় মালিকানাকেও আনতে হবে। শুধু চালককে লাইসেন্স দিয়ে মালিককে অদৃশ্য রাখলে নিয়ন্ত্রণ অসম্পূর্ণ থাকবে। একইভাবে সব মালিককে ‘সিন্ডিকেট’ এবং সব চালককে ‘নিরীহ’ ধরে নেওয়াও তথ্যভিত্তিক নীতি তৈরির পথে বাধা। কোথায় ব্যক্তিগত মালিকানা, কোথায় গ্যারেজভিত্তিক ব্যবসা, কোথায় একাধিক গাড়ির মালিকানা এবং কোথায় অননুমোদিত চার্জিং ব্যবসা—এসবের তথ্যভিত্তিক মানচিত্র প্রয়োজন।

এই বিতর্কে ১লা সেপ্টেম্বর আরেকটি দিক সামনে আসে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন সরকারকে আইনি নোটিশ দিয়ে প্যাডেল রিকশা বন্ধ, নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন ও পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান। নোটিশে প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত বিষয় বিবেচনার কথাও বলা হয়েছে।

নোটিশে গতি নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর ব্রেকিং ব্যবস্থা, মানসম্মত ব্যাটারি, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক চার্জিং ব্যবস্থার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি রয়েছে।

এটি দেখায়, বিতর্কটি এখন আর শুধু ‘রিকশা থাকবে কি থাকবে না’—এই দ্বিমুখী প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। নিরাপদ প্রযুক্তি, গণপরিবহন, পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার—সবই আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে একটি আইনি নোটিশকে আদালতের আদেশ বা সরকারের চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একজন আইনজীবীর উত্থাপিত দাবি—এই পার্থক্যটি সংবাদ পরিবেশনে পরিষ্কার রাখা জরুরি।

ধরা যাক, একটি এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ রিকশা চলছে। গবেষণা করে সরকার সিদ্ধান্ত নিল, ওই এলাকায় এর অর্ধেকের বেশি রাখা যাবে না। তাহলে প্রশ্ন উঠবে—বাকি চালকদের কী হবে?

এই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে এর উত্তর শুধু পরিবহননীতির ভেতর খুঁজলে চলবে না।

পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে নিরাপদ ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থান হারানো মানুষের পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন বা বিকল্প কাজের সুযোগ তৈরি করা হবে শ্রম, কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সুরক্ষা নীতির অংশ।

অর্থাৎ পরিবহন নিয়ন্ত্রণ এবং জীবিকা সুরক্ষা—দুটি আলাদা কিন্তু সমন্বিত নীতির প্রয়োজন।

একটির বাস্তবায়নকে অন্যটির সম্পূর্ণ সমাধানের ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে কোনো নীতিই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

বর্তমান বাস্তবতায় একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে তিন ধাপে।

প্রথমত, অবৈধ ও অনিরাপদ যান তৈরির উৎস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারখানা, গ্যারেজ, চার্জিং স্টেশন ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের তথ্যভিত্তিক নিবন্ধন প্রয়োজন। অনুমোদিত নকশা ও কারিগরি মান ছাড়া নতুন যান বাজারে আসার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান যানকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা মানে আনতে হবে। ব্রেক, আলো, স্টিয়ারিং, সাসপেনশন, কাঠামো, ব্যাটারি, গতি এবং যাত্রী ধারণক্ষমতার জন্য নির্দিষ্ট মান নির্ধারণ করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, রাস্তা ও জোনভিত্তিক সীমা নির্ধারণ করতে হবে। প্রধান সড়কে যেখানে চলাচল নিরাপদ বা বাস্তবসম্মত নয়, সেখানে নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সড়কে নির্দিষ্ট সংখ্যক নিবন্ধিত ও মানসম্মত যান চলতে পারে।

সরকারের আট জোন, রঙভিত্তিক পরিচিতি এবং ভবিষ্যতে জিও-ফেন্সিংয়ের পরিকল্পনা এই কাঠামোর অংশ হতে পারে। সাম্প্রতিক সরকারি পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এমন ব্যবস্থার কথাই উঠে এসেছে।

তবে প্রযুক্তি চালু করাই শেষ কথা নয়। জিও-ফেন্সিং থাকলেও চালকের প্রশিক্ষণ, যানটির ফিটনেস, চার্জিং অবকাঠামো এবং বাস্তবসম্মত রুট না থাকলে ব্যবস্থা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ঢাকার পরিবহন সংকটের জন্য শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশাকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু শহরের যানজট একটি বহুস্তরীয় সমস্যা।

সড়কের ধারণক্ষমতা সীমিত। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার রয়েছে। গণপরিবহনের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল অনানুষ্ঠানিক পরিবহন খাত।

এই বাস্তবতায় ব্যাটারিচালিত রিকশা একই সঙ্গে সমস্যা এবং সমাধানের অংশ।

সমস্যা—কারণ অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন দুর্ঘটনা, বিশৃঙ্খলা ও যানজট বাড়াতে পারে।

সমাধানের অংশ—কারণ এটি তুলনামূলক কম খরচে স্বল্প দূরত্বে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি করেছে এবং বহু মানুষের আয়ের পথ হয়েছে।

তাই নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়—‘সব রিকশা থাকবে’ কিংবা ‘সব রিকশা উচ্ছেদ হবে’।

লক্ষ্য হওয়া উচিত—কতগুলো থাকবে, কোথায় থাকবে, কী মানের হবে, কে চালাবে এবং কীভাবে জবাবদিহির মধ্যে থাকবে।

একই সঙ্গে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য রূপান্তরকালীন নীতিও থাকতে হবে।

শেষ পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রশ্নটি কেবল রিকশার প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের নগর পরিবহন, কর্মসংস্থান, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতার একটি পরীক্ষা।

শুধু রাস্তা খালি করার লক্ষ্য নিয়ে অভিযান চালালে হয়তো সাময়িকভাবে দৃশ্যপট বদলাবে। কিন্তু যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা মানুষকে এই পরিবহনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেটি বদলাবে না।

আর সেই বাস্তবতা না বদলালে একটি যান সরিয়ে তার জায়গায় অন্য একটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

সুতরাং সমাধান রিকশা বনাম গাড়ি নয়। সমাধান হলো—নিরাপদ যান, নির্ধারিত রুট, নিবন্ধিত চালক, জবাবদিহিমূলক মালিকানা, নিয়ন্ত্রিত চার্জিং এবং বাস্তবসম্মত গণপরিবহনের সমন্বিত নীতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *