চীনের মডেলে আধুনিকায়ন হবে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা

বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা আধুনিকায়ন নিয়ে চীনে সম্মেলন

চীনের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, চীনা ভাষা শিক্ষা, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, ইন্টার্নশিপ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষাকে আরও কর্মমুখী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া সোমবার সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব পরিকল্পনার কথা জানান।

সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালে স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রম, ২০২৭ সালে মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম এবং ২০২৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় চলতি বছরই বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষকদের একটি দলকে চীনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা ভাষা শেখানোর কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চীনে ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরির জন্য একটি পাইলট কর্মসূচিও চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব কর্মপরিবেশে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেতে পারেন।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০২৭ সালে গাজীপুরে জাতীয় কারিগরি শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমি এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বাড়ানোকে এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সময়ে মিরসরাইকে জাতীয় কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান দাউদ মিয়া।

আলোচনায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি আধুনিক কারিগরি গবেষণাগার এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। চীনা ভাষার সহায়তাসহ কারিগরি শিক্ষা চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষাকে শুধু শ্রেণিকক্ষনির্ভর না রেখে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে পরিকল্পনায়।

পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারিগরি শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করা।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চীনে প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশে কার্যরত চীনা শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীরা চীনের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মপরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করলে তাদের দক্ষতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে দেশে চীনা বিনিয়োগ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সংযোগ তৈরি হলে প্রশিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০২৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও চীনের কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতার জন্য একটি টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

দাউদ মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করাই এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য।

তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, আধুনিক সরঞ্জাম ও গবেষণাগারের ব্যবহার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ এবং প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর।

২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের এই ধাপে ধাপে পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষায় শুধু অবকাঠামোগত পরিবর্তন নয়, শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে আরও কার্যকর সম্পর্ক তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *