বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের সম্পর্ক তুলে ধরে ঢাকায় বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭শে অক্টোবর) বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এ আয়োজন করে বাংলাদেশ বৌদ্ধ ঐতিহ্য গবেষণা ট্রাস্ট।
সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং এশিয়ায় আন্তঃসাংস্কৃতিক আদান-প্রদান’। এতে বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান সমাজে এ ঐতিহ্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ বৌদ্ধ ঐতিহ্য গবেষণা ট্রাস্টের ট্রাস্টি ভদন্ত সুনন্দ ভিক্ষুর স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেমিনার শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাপানের শিজুওকা শিল্প ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক শিমোসাওয়া তাকাশি। তিনি বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে এ ঐতিহ্যের সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক সংযোগের বিষয়েও আলোকপাত করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষা বিভাগের প্রধান ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুসনে জাহান।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের সর্বশেষ শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে টিকে ছিল। বাংলাদেশ একসময় বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
অধ্যাপক শাহনাজ হুসনে জাহান জানান, ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাঁদের অধিকাংশ থেরবাদ মতাদর্শের অনুসারী। তাঁরা মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান অঞ্চলে বসবাস করেন।
মূল প্রবন্ধে বৌদ্ধ ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়। এ ঐতিহ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সহনশীলতা, শান্তি ও পারস্পরিক সদিচ্ছার শিক্ষা বর্তমান সমাজে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়েও আলোচনা করেন।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বৌদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. বিমান চন্দ্র বড়ুয়া। তিনি বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য রক্ষা ও সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সেমিনারের সভাপতি ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ ঐতিহ্য গবেষণা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সবুজ বড়ুয়া বলেন, প্রতিষ্ঠানটি একটি অলাভজনক শিক্ষামূলক গবেষণা সংস্থা। বৌদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, বৌদ্ধ শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার এবং বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরাই এর প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে নওগাঁর পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার, জগদ্দল মহাবিহার, বাসু বিহার, মহাস্থানগড়, সীতাকোট বিহার, উয়ারী-বটেশ্বর, কুমিল্লার ময়নামতিতে শালবন বিহার, চট্টগ্রামের পণ্ডিত বিহার এবং মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরী মহাবিহার।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিক্রমপুর ছিল বাংলার প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান। বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জীবন্ত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোরও সম্পর্ক রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার এবং চট্টগ্রামের বৌদ্ধবিহারের কথা তুলে ধরেন। ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে অতীশ দীপঙ্করের পবিত্র দেহভস্ম সংরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি জানান। চট্টগ্রামের বৌদ্ধবিহারে বুদ্ধের পবিত্র কেশধাতু সংরক্ষিত থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
সবুজ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের বৌদ্ধ ঐতিহ্য জাতীয় পরিচয় ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ ঐতিহ্য রক্ষা করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
সেমিনারের সমাপনী পর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ বৌদ্ধ ঐতিহ্য গবেষণা ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ দেবাশীষ বড়ুয়া। তিনি অতিথি, আলোচক, আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নওমি বড়ুয়া ও এ্যালি মারমা। এতে বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পণ্ডিত, গবেষক, ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞ, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা, গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
আরো পড়ুন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন