রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায় বারভিডা

ঢাকা ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন বারভিডার নেতারা।

ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে শর্তসাপেক্ষে আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)। সংগঠনটির মতে, নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবহৃত ইভি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা বৈষম্যমূলক। এতে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে পরিবেশবান্ধব গাড়ি আনার সুযোগ সীমিত হবে।

বুধবার (৯ই  সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় বারভিডা। সংগঠনের সভাপতি আবদুল হক লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সরকার ইভির প্রসার চায়—বারভিডাও সেই লক্ষ্যকে সমর্থন করে। তবে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভির জন্য পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার বদলে নিরাপত্তা ও কারিগরি মান নিশ্চিত করে নিয়ন্ত্রিত আমদানি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৫শে আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ প্রকাশ করেছে। বারভিডার দাবি, নতুন নীতিতে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংগঠনটি বলছে, আগের নীতিতে ব্যবহৃত ইভি আমদানির সুযোগ ছিল।

বারভিডার সভাপতি বলেন, তারা সরকারের ইভি নীতির বিরোধিতা করছেন না। বরং একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতির দাবি জানাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে বয়স, ব্যাটারির সক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত মান বিবেচনায় নিয়ে আমদানির অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

সংগঠনটি প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পুরোনো ব্যবহৃত বা রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির অনুমতি চেয়েছে। একই সঙ্গে গাড়ির ব্যাটারির ন্যূনতম স্টেট অফ হেলথ (এসওএইচ) ৭০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।

বারভিডা ব্যবহৃত ইভির ক্ষেত্রে একটি নিয়ন্ত্রিত আমদানি কাঠামো প্রস্তাব করেছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আমদানির আগে অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে গাড়ি ও ব্যাটারি পরীক্ষা করে প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, গুরুতর দুর্ঘটনা বা কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইভি আমদানি নিষিদ্ধ করার কথাও বলেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি ইভি ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ অপসারণের জন্য পৃথক নীতিমালা তৈরির সুপারিশ করেছে।

বারভিডার প্রস্তাবে চার্জিং স্টেশন, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক, সার্ভিসিং ও ব্যাটারি রিসাইক্লিং খাতে বিনিয়োগের জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা অব্যাহত রাখার কথাও রয়েছে।

বারভিডার মূল যুক্তিগুলোর একটি হলো গাড়ির দাম। সংগঠনটির মতে, নতুন ইভি এখনো দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের বড় অংশের নাগালের বাইরে। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি তুলনামূলক কম দামে বাজারে এলে ইভির ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে।

সরকারও চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন ইভির ব্যবহার বাড়াতে করছাড় দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের আমদানিকৃত ইভির মোট করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের আমদানি করও শূন্যে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে নতুন ইভি বাজার সম্প্রসারণে সরকার কর সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবহৃত ও রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানির পথ বন্ধ হয়েছে। বারভিডা এই দুই নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য আনার দাবি জানাচ্ছে।

বারভিডা বলছে, জাপান থেকে রিকন্ডিশন্ড ইভি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সংগঠনটির দাবি, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট শর্তে এসব গাড়ি আমদানি করা হয়।

তাদের বক্তব্য, ব্যবহৃত ইভির ক্ষেত্রে গাড়ির বয়সকে একমাত্র মানদণ্ড না করে ব্যাটারির অবস্থা, নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার ইতিহাস এবং কারিগরি সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বারভিডা আরও বলছে, রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রেও একই ধরনের আপত্তি একসময় উঠেছিল। পরে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড আমদানির সুযোগ চালু হলে দেশের বাজারে জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ির ব্যবহার বাড়ে। সংগঠনটি সেই অভিজ্ঞতাকে ব্যবহৃত ইভির ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছে।

ব্যবহৃত ইভি আমদানিতে বিভিন্ন দেশের নীতির উদাহরণও তুলে ধরেছে বারভিডা। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, জর্জিয়া, নিউজিল্যান্ড, কেনিয়া, সৌদি আরব, আয়ারল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, কাজাখস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়ায় বিভিন্ন শর্তে ব্যবহৃত ইভি আমদানির সুযোগ রয়েছে।

তবে এসব দেশের নিয়ম এক নয়। কোথাও গাড়ির বয়সসীমা রয়েছে। কোথাও নির্দিষ্ট কারিগরি ও নিরাপত্তা পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে বারভিডার প্রস্তাবের মূল বিষয় হলো বাংলাদেশের জন্যও একটি শর্তসাপেক্ষ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামো তৈরি করা।

বারভিডা শুধু আমদানি নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নয়, দেশের ইভি বাজারের দুর্বল অবকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে এখনো ইভি নিয়ে ভোক্তার আস্থা তৈরি হয়নি। পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন নেই। ব্যাটারি পরীক্ষা ও মেরামতের দক্ষ জনবলও সীমিত। ফলে শুধু কর কমালেই ইভির বাজার দ্রুত বড় হবে না। সরকার এ কারণে চার্জিং অবকাঠামো তৈরিতেও কর সুবিধা দিয়েছে। বাজেটে ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানির মোট করভার ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বারভিডার মতে, দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক ইভি চলাচল না করলে চার্জিং স্টেশনে বেসরকারি বিনিয়োগও হবে না। আবার চার্জিং অবকাঠামো ছাড়া ইভির বাজারও বড় হবে না। তাই আমদানি, ব্যবহার ও অবকাঠামো উন্নয়নকে একই নীতির আওতায় দেখতে হবে।

রিকন্ডিশন্ড ইভির একটি নিয়ন্ত্রিত বাজার তৈরি হলে নতুন ধরনের কারিগরি দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে বলে মনে করছে বারভিডা। এর মধ্যে রয়েছে হাই-ভোল্টেজ নিরাপত্তা, ব্যাটারি ডায়াগনস্টিক, মোটর ও কন্ট্রোলার সার্ভিসিং, সফটওয়্যার ডায়াগনস্টিক এবং ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। ভবিষ্যতে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিং খাতেও বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

বারভিডার যুক্তি, রিকন্ডিশন্ড ইভিকে দেশীয় ইভি শিল্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে শিল্প গড়ে ওঠার একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আমদানি, ব্যবহার, সার্ভিসিং, যন্ত্রাংশ, দক্ষতা, অ্যাসেম্বলি ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ইভি শিল্প গড়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে ইভির বাজার যে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, সরকারি নিবন্ধন তথ্যেও তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বারভিডা বিআরটিএ -এর তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৫১৫টি ইভি নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৫টি, ২০২২ সালে ৮টি, ২০২৩ সালে ৬১টি, ২০২৪ সালে ২৬৭টি এবং ২০২৫ সালে ১৭৪টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়। এই ৫১৫টির মধ্যে ২৭৩টি মোটরসাইকেল, ১৬০টি হার্ডটপ জিপ, ৭৭টি প্রাইভেট কার, ৩টি মাইক্রোবাস এবং একটি করে ডেলিভারি ভ্যান ও অটোরিকশা রয়েছে।

বারভিডা ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রেও সরকারের প্রণোদনার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংগঠনটির বক্তব্য, ২০২৬ সালের ৭ই  এপ্রিল শিক্ষার্থী পরিবহনে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক-কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও এ ধরনের যানবাহন আমদানির দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বারভিডার মতে, এই পরিস্থিতির কারণ খুঁজে দেখা দরকার। তাদের ধারণা, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং বাজারে আস্থার সংকট এর অন্যতম কারণ হতে পারে।

বারভিডা জানিয়েছে, তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়। তবে দাবি বিবেচনা করা না হলে মানববন্ধন, শোরুম বন্ধ রাখাসহ কর্মসূচি নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি। সভাপতি আবদুল হক প্রয়োজনে রাজপথে কর্মসূচি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সংগঠনটির প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দু হলো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়ন্ত্রিত আমদানি চালু করা। তাদের আট দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ, ব্যাটারির ন্যূনতম ৭০ শতাংশ এসওএইচ, আমদানির আগে বাধ্যতামূলক পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়ি নিষিদ্ধ করা, ব্যাটারি রিসাইক্লিং নীতিমালা এবং নির্দিষ্ট সময় পর নীতির ফলাফল মূল্যায়ন।

বারভিডার মতে, ইভি নীতিকে শুধু গাড়ি আমদানির বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, চার্জিং অবকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ দেশীয় শিল্প—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু ব্যবহৃত ইভি আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ইভি বাজারকে কীভাবে গড়ে তুলবে—নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে, নাকি নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মাধ্যমে। বর্তমান বিতর্কে বারভিডা দ্বিতীয় পথটির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *