অবহেলা নয়, চাই পরম মমতা: বিশেষ শিশুদের মুখে হাসি ফোটালো হিউম্যানিটি ফার্স্ট

নারায়ণগঞ্জের সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করছেন অতিথিরা

 

আমাদের চারপাশে কত হাজারও মানুষ প্রতিদিন ব্যস্ত পায়ে হেঁটে চলে। কেউ দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছায়, কেউ বা পেছনে পড়ে থাকে। কিন্তু এই পৃথিবীর কিছু শিশু আছে, যাদের চলার গতি আমাদের মতো চঞ্চল নয়, যাদের চোখ দুটো অনন্য সুন্দর এক নিষ্পাপ কৌতূহলে ভরা। সমাজের ভাষায় আমরা তাদের বলি ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু’। অথচ একটু গভীর নজর দিলে বোঝা যায়—তারা বিশেষ কোনো চাহিদা নিয়ে জন্মায়নি, তাদের একমাত্র চাহিদা হলো একটুখানি ভালোবাসা আর পরম মমতা।

মঙ্গলবার (৮ই সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টা। নারায়ণগঞ্জের শহরের শায়েস্তা খান রোডের সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যেন এক পশলা রোদেলা আলো নেমে এসেছিল। “মানবতার বন্ধনে—শিক্ষা, সহমর্মিতা ও মানবসেবার প্রত্যয়ে” শীর্ষক এক সুন্দর মানবিক আয়োজন নিয়ে এই শিশুদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ‘হিউম্যানিটি ফার্স্ট বাংলাদেশ’।

বিদ্যালয়ের প্রায় ৬০ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হলো নতুন স্কুল ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। একটি নতুন স্কুল ব্যাগ পাওয়ার পর সেই নিষ্পাপ শিশুদের মুখে যে ভুবনজয়ী হাসি ফুটে উঠেছিল, তার দাম কোটি টাকা দিয়েও মেটানো সম্ভব নয়। আয়োজনের শেষলগ্নে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও অতিথিদের জন্য ছিল দুপুরের খাবারের এক উষ্ণ আপ্যায়ন।

এই মানবিক উদ্যোগটি শুধু কিছু খাতা-কলম আর ব্যাগ বিতরণের গল্প নয়। হিউম্যানিটি ফার্স্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. ইউনুস আলী যখন কথা বলছিলেন, তাঁর কণ্ঠে ছিল এক গভীর আত্মোপলব্ধি। তিনি বলেন, “এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষার্থীদের হাতে স্কুল ব্যাগ তুলে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতি সমাজের ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “একটি স্কুল ব্যাগ একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে সামান্য সহযোগিতা করতে পারে। তবে এর সঙ্গে ভালোবাসা ও মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে তা বৃহত্তর সামাজিক বন্ধনের সূচনা করতে পারে।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম এ ধরনের মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে এই সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, সুইড বাংলাদেশের মেন্টর জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন, মহাসচিব মাহবুবুল মনির এবং খবরের পাতা সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মাসুম। এছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এক হয়ে এই শিশুদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেন।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ‘হিউম্যানিটি ফার্স্ট’ আজ বিশ্বজুড়ে এক ভালোবাসার নাম। বিশ্বের ৬৭টি দেশে ছড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি গত ৩০ বছরে ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের ‘নলেজ ফর লাইফ’ প্রকল্পের আওতায় ১০০টির বেশি স্কুল ও ৫৬টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশেও দুর্যোগে ত্রাণ, চিকিৎসা, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি তাদের ‘কমিউনিটি কেয়ার’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিশুদের সামাজিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনার এই লড়াই সত্যি প্রশংসনীয়।

“পৃথিবীর কোনো একটি শিশুর মুখেও যদি হাসি ফোটানো যায়, তবে মনে রাখতে হবে—মানুষ এখনো মানুষের ওপর থেকে আশা হারিয়ে ফেলেনি।” নারায়ণগঞ্জের এই ছোট্ট আয়োজনটি আমাদের সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই নিষ্পাপ শিশুদের ভালোবাসার দুয়ার খুলে দিলে, একদিন হয়তো আমাদের এই সম্পূর্ণ সমাজটাই এক সুন্দর, আলোকিত সামাজিক বন্ধনে জড়িয়ে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *