জার্মানির মেনডিগে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের ৫০তম বার্ষিক জলসা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ৪৮ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জার্মানির রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেটের মেনডিগ বিমানঘাঁটিতে এবারের জলসা অনুষ্ঠিত হয়।
৪ঠা সেপ্টেম্বর শুক্রবার, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকার সঙ্গে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর দোয়ার মাধ্যমে জলসার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত জার্মানির ন্যাশনাল আমীর আব্দুল্লাহ ওয়াগিস হাউজার।
তিন দিনের এই আয়োজনে পবিত্র কুরআনের শিক্ষা, ইসলামের শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা পরিবার ও সন্তান লালন-পালনে পিতামাতার দায়িত্ব নিয়েও বক্তব্য দেন। ইসলামী অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
জলসার দ্বিতীয় দিনে যুক্তরাজ্য থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব খলীফা হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ (আই.)। তিন দিনের জলসায় বিভিন্ন দেশের অতিথি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও অংশ নেন। জলসা উপলক্ষে কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ভিডিও ও লিখিত বার্তা পাঠান।
৬ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৩০ মিনিটে যুক্তরাজ্য থেকে জলসার সমাপনী ভাষণ দেন হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ (আই.)।
সমাপনী বক্তব্যে তিনি যথাসময়ে নামাজ আদায়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শিরক থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার বিষয়েও তিনি আহমদীদের প্রতি আহ্বান জানান।
ঋণ পরিশোধের বিষয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষার আলোকে তিনি দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে বিশ্বে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আহমদী মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথাও তুলে ধরেন।
ভাষণের শেষে তিনি বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া পরিচালনা করেন।
আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বার্ষিক জলসায় যুক্তরাজ্য ও জার্মানির আয়োজন দুটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এবারের জার্মানি জলসায় ৪৮ হাজারের বেশি মানুষের উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছে। এর এক মাস আগে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত বার্ষিক জলসায় উপস্থিতি ছিল ৫০ হাজারের বেশি।
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের আহমদীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। জার্মানির এবারের ৫০তম জলসাও সেই ধারাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
জার্মানিতে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের কার্যক্রমের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর। ১৯২২ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মাওলভী মোবারক আলীকে জার্মানিতে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বার্লিনে গিয়ে আহমদীয়া মিশনের কার্যক্রম শুরু করেন।
১৯২৩ সালে বার্লিনে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মোবারক আলীর উদ্যোগে জমি সংগ্রহ করা হয় এবং ওই বছরের ৬ আগস্ট মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও বিভিন্ন দেশের মুসলিম প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে জার্মানির তৎকালীন অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত থেমে যায়। পরে ওই প্রকল্পের জায়গাটি হাতছাড়া হয়।
জার্মানিতে আহমদীয়া আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে বার্লিনের মসজিদ নির্মাণের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। পরবর্তী সময়ে বার্লিনে আহমদীয়া সংশ্লিষ্ট আরেকটি মসজিদ নির্মিত হয়। বর্তমানে জার্মানিতে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের কার্যক্রম দেশটির মুসলিম ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
এবারের ৫০তম জলসার মাধ্যমে জার্মানিতে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের দীর্ঘ পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক উদ্যাপিত হলো। আয়োজকদের ভাষায়, জলসার মূল লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় জ্ঞান, আত্মিক উন্নতি এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের চর্চা।