প্রতি পাঁচজন ইন্টারনেট-ব্যবহারকারী শিশুর একজন যৌন নিপীড়নের শিকার: ইউনিসেফ

ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় শিশুদের অনলাইন যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি

 

আজকের শিশুরা জন্মায় ইন্টারনেটের আলোয়। তাদের হাতে স্মার্টফোন, পাশে ট্যাবলেট—শেখার, খেলার এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু এই ডিজিটাল দুনিয়ার উজ্জ্বল আলোর পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকে দেওয়া তথ্য—‘থ্রু চিল্ড্রেন আইস: হাউ ডিজিটাল টেকনোলজিস এনাবেল চাইল্ড সেক্সুয়াল এবিউস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২১টি দেশে এক বছরে আনুমানিক ২ কোটি ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট-ব্যবহারকারী শিশু প্রযুক্তি-সহায়তায় যৌন শোষণ বা নিপীড়নের অন্তত একটি ধরনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে।

প্রতিবেদনটি শুধু সংখ্যা নয়, শিশুদের মুখে শোনা যন্ত্রণার গল্পও তুলে ধরেছে। ইউনিসেফ-এর নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, “এই প্রতিবেদন একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে। আমরা যা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারি না।”

ইউনিসেফ-এর হিসাবে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে এক বছরে প্রায় ২ কোটি শিশু প্রযুক্তি-সহায়তায় যৌন নিপীড়ন বা শোষণের শিকার হয়েছে। গবেষণাটি ‘টেকনোলজি-ফ্যাসিলিটেটেড চাইল্ড সেক্সুয়াল এক্সপ্লোয়টেশন এন্ড এবিউজ’ বা প্রযুক্তি-সহায়তায় শিশু যৌন শোষণ ও নিপীড়নকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌন কনটেন্ট দেখানো, যৌন ছবি চাওয়া, ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, যৌন হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন ধরনের আচরণ অন্তর্ভুক্ত।

ইউনিসেফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক শিশু এমন অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানায় না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশু অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্টের সংস্পর্শে এসেছে। প্রায় ৯০ লাখ শিশুকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন কথোপকথনে যুক্ত হতে অথবা নগ্ন ছবি শেয়ার করতে বলা হয়েছে। আরও প্রায় ৪০ লাখ শিশুর নগ্ন ছবি তাদের সম্মতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, শিশুদের জন্য পরিচিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে যৌন শোষণ ও নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

নিপীড়নের ক্ষেত্র হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে। অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে ঘটেছে ১৪ শতাংশ ঘটনা। ফলে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; গেমিং ও অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুরক্ষা প্রয়োজন।

অনলাইন নিপীড়নকারী মানেই অপরিচিত ব্যক্তি—এমন ধারণারও বিরোধিতা করেছে গবেষণাটি। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে নিপীড়ক ছিল শিশুটির পরিচিত কেউ—সহপাঠী, প্রেমিক/প্রেমিকা, বন্ধু বা পরিবারের সদস্য। একই সঙ্গে ৩৮ শতাংশ শিশু প্রথম অনলাইনেই নিপীড়কের সঙ্গে পরিচিত হয়, যেখানে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত বার্তা ছিল প্রধান হাতিয়ার।

অর্থাৎ ঝুঁকিটি শুধু অচেনা মানুষের কাছ থেকে আসে না। শিশুর পরিচিত সামাজিক পরিসরও ডিজিটাল নিপীড়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই ধরনের অভিজ্ঞতার প্রভাব শুধু একটি অনলাইন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইউনিসেফ-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রযুক্তি-সহায়তায় যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা পাওয়া শিশুরা অন্য শিশুদের তুলনায় আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণের ক্ষেত্রে চার গুণ বেশি ঝুঁকিতে ছিল। আত্মক্ষতির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তাদের উদ্বেগের মাত্রা অন্য শিশুদের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি ছিল। কিছু দেশে এই ঝুঁকি আরও ভয়াবহ। মেক্সিকো ও নর্থ মেসিডোনিয়ায় নিপীড়নের শিকার শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা আটগুণ বেশি। পাকিস্তানে আত্মক্ষতির ঝুঁকি ছিল সাতগুণের বেশি।

ইউনিসেফ বলছে, এসব অভিজ্ঞতার প্রভাব শিশুদের পড়াশোনা, সম্পর্ক, নিরাপত্তাবোধ ও দৈনন্দিন জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ না করার প্রবণতা।

৪০ শতাংশের বেশি ঘটনা কারো কাছেই জানানো হয়নি। আর পুলিশ, সমাজকর্মী বা হেল্পলাইনের মতো কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে ১ শতাংশেরও কম ঘটনা। শিশুরা নীরবতা পালনের সবচেয়ে বড় কারণ? জানে না কোথায় যাবে বা কাকে বলবে। ফলে কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো ঘটনাগুলো সমস্যার পুরো চিত্র তুলে ধরে না। বরং প্রকাশ্যে না আসা ঘটনাগুলোর কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।

ইউনিসেফ মনে করে, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব শিশু বা পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার, স্কুল, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদভাবে নকশা করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের জন্য শক্তিশালী গোপনীয়তা সুরক্ষা, প্রাপ্তবয়স্কদের অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ সীমিত করা, নিরাপদ সুপারিশ ব্যবস্থা এবং নিপীড়ন শনাক্ত ও রিপোর্ট করার কার্যকর ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ, যাতে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ধরনের নিপীড়নও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে শিশুদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

ইউনিসেফ বিশেষভাবে এআই-নির্মিত যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট এবং যৌন হয়রানির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের মতো নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় আইন ও প্রয়োগব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে। অর্থাৎ শিশু সুরক্ষার নীতি শুধু প্রচলিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আচরণ নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। নতুন প্রযুক্তি কীভাবে অপব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ইউনিসেফ-এর নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেছেন, সরকার ও প্রযুক্তি কোম্পানিসহ সবাইকে অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষায় আরও বেশি পদক্ষেপ নিতে হবে।

ডিজিটাল জগত থেকে শিশুদের দূরে রাখা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং তারা যেখানে শেখে, খেলে ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সেই ডিজিটাল পরিসরকে নিরাপদ করে তোলাই প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কোনো শিশু নিপীড়নের শিকার হলে তাকে দোষারোপ না করে দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-বান্ধব রিপোর্টিং ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্কুলের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে ইউনিসেফ।

কারণ প্রযুক্তি-সহায়তায় শিশু যৌন নিপীড়ন শুধু অনলাইনে ঘটে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর প্রভাব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

ডিজিটাল দুনিয়ায় শিশুরা যেন নিরাপদে শিখতে, খেলতে ও বড় হতে পারে—এটি কেবল একটি স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ, যখন একটি শিশু অনলাইনে নিঃশব্দে কাঁদে, তার আর্তনাদ কি কেবল স্ক্রিনের আড়ালেই থেকে যাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *