ফুলবাড়ী কয়লা খনি: আবারও কি জেগে উঠছে পুরোনো ক্ষত?

ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলন

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখা। সংগঠনটি বলছে, পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লা খনির মূল পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি এড়ানো যাবে না।

বুধবার (২রা সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য ফুলবাড়ীর উচ্চমানের কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত হলে আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই ফুলবাড়ী জাতীয় কমিটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থান তুলে ধরে। সংগঠনটির দাবি, সরকারের বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ফুলবাড়ী প্রকল্পকে নতুন করে সামনে আনার ইঙ্গিত রয়েছে।

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত প্রায় দুই দশক আগে। ২০০৬ সালের ২৬শে আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতায় বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা এশিয়া এনার্জির প্রকল্প বাতিল এবং স্থানীয় মানুষের জমি, বসতভিটা, কৃষি ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

ওইদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আল-আমিন, সালেকিন ও তরিকুল নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। এরপর টানা আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালের ৩০শে আগস্ট তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি করে।

চুক্তির দাবিগুলোর মধ্যে ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা, নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং গুলিবর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের ব্যবস্থা।

তবে চুক্তির সব শর্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে ফুলবাড়ীবাসী ও জাতীয় কমিটি।

ফুলবাড়ী প্রকল্পের কারিগরি, পরিবেশগত ও নীতিগত দিক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারি পর্যায়ে একাধিক কমিটি কাজ করেছে। এর মধ্যে অধ্যাপক নূরুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন কমিটির ২০০৬ সালের রিপোর্ট, অধ্যাপক আবদুল মতিন পাটোয়ারী নেতৃত্বাধীন কমিটির কয়লা নীতি সংক্রান্ত কাজ এবং মোশাররফ হোসেন নেতৃত্বাধীন কমিটির মূল্যায়ন বিশেষভাবে আলোচিত।

বিশেষজ্ঞ কমিটিগুলোর মূল্যায়নে ফুলবাড়ীর ভূতাত্ত্বিক ও পানিসম্পদগত বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে নূরুল ইসলাম কমিটির রিপোর্টে প্রকল্পের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও আইনগত বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল।

পরে মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিটির রিপোর্টেও ভূগর্ভস্থ পানির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। একটি বিশ্লেষণে ওই রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ফুলবাড়ীর ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি বিশ্বের অনেক উন্মুক্ত কয়লা খনি এলাকার তুলনায় ভিন্ন। এখানে কয়লার স্তরের ওপরে পানিবাহী স্তর থাকায় খনির জন্য ব্যাপক পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন হতে পারে।

একই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নূরুল ইসলাম কমিটির মূল্যায়নে খনি এলাকার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে পানির স্তর নেমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মোশাররফ কমিটির রিপোর্টে প্রায় ২৭ কিলোমিটার পর্যন্ত কৃষি ও গৃহস্থালির পানির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার বক্তব্য, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি খনির আওতায় চলে যাবে। একই সঙ্গে খনি পরিচালনার জন্য ভূগর্ভস্থ পানি অপসারণ করতে হলে আশপাশের কৃষি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

ফুলবাড়ী প্রকল্পের আয়তন ৫ হাজার ১৯৩ হেক্টর। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ বর্তমানে কৃষিজমি বলে প্রকল্পের উদ্যোক্তা জিসিএম রিসোর্সেসের ওয়েবসাইটেই উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানিটি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খননকে প্রকল্পের জন্য উপযোগী বলে দাবি করে এবং পুনর্বাসন ও জমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনার কথাও বলছে।

জিসিএমের হিসাবে, ফুলবাড়ীতে প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার সম্পদ রয়েছে। কোম্পানিটি বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানো সম্ভব হবে।

অর্থাৎ প্রকল্পটির পক্ষে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের যুক্তি রয়েছে। বিপরীতে বিরোধীদের মূল আপত্তি জমি, পানি, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে। এই দুই অবস্থানের দ্বন্দ্বই ফুলবাড়ী প্রকল্পকে বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির অন্যতম বিতর্কিত ইস্যুতে পরিণত করেছে।

ফুলবাড়ী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিটি আগে এশিয়া এনার্জি নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে কোম্পানিটির নাম জিসিএম রিসোর্সেস পিএলসি। কোম্পানিটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তারা ২০০৩ সালে এশিয়া এনার্জি পিএলসি নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ফুলবাড়ী প্রকল্পের উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে কাজ করে।

জিসিএম এখনো ফুলবাড়ী প্রকল্পকে উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। কোম্পানির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২০২৭ সাল পর্যন্ত পাওয়ারচায়নার সঙ্গে প্রকল্প উন্নয়নসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকও বাড়ানো হয়েছে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে।

ফলে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর ফুলবাড়ী প্রকল্পের সম্ভাব্য পুনরুজ্জীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখা তিনটি দাবি জানিয়েছে।

প্রথমত, ৬ দফা ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উন্মুক্ত কয়লা খনির পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জিসিএম রিসোর্সেসের বিরুদ্ধে অবৈধ শেয়ার ব্যবসার অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং কোম্পানিটিকে দেশ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

তৃতীয়ত, ফুলবাড়ী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, ফুলবাড়ীর জনগণের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা তা মেনে নেবে না। সরকার অবস্থান পরিবর্তন না করলে ২০০৬ সালের মতো বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।

ফুলবাড়ী নিয়ে সরকারের সামনে এখন মূল প্রশ্নটি শুধু কয়লা উত্তোলন করা হবে কি না, তা নয়। জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনের সঙ্গে কৃষি, পানি, পরিবেশ, পুনর্বাসন এবং প্রায় দুই দশক আগে করা সরকারি চুক্তির প্রতিশ্রুতি কীভাবে সমন্বয় করা হবে—সেটিই হয়ে উঠছে নতুন বিতর্কের কেন্দ্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *