বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির নতুন অধ্যায়, তবে মূল চালিকাশক্তি সার্জনই

ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে রোবোটিক সার্জারিতে ব্যবহৃত মেডবট টুমাই সার্জিক্যাল রোবট

বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুক্ত হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। ৩১শে আগস্ট রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউয়ের ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবা চালুর অংশ হিসেবে একই দিনে দুটি রোবোটিক অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচার দুটিতে ব্যবহার করা হয় মেডবট টুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট। প্রথম অস্ত্রোপচারটি ছিল ৫৭ বছর বয়সী এক পুরুষের রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি। গলস্টোনের কারণে তার পিত্তথলি অপসারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারটির নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহিন।

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারটি ছিল ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর রোবোটিক হিস্টেরেক্টমি। জরায়ুতে অস্বাভাবিক রক্তপাতের চিকিৎসায় তার জরায়ু অপসারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারটি করেন অধ্যাপক ডা. সামসাদ জাহান (শেলি)।

ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের এই উদ্যোগকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশে প্রথম নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ডিজিডিএ-এর একজন পরিচালকও জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের পর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারসহ দুটি বেসরকারি হাসপাতালকে রোবোটিক সার্জারি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

রোবোটিক সার্জারি নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—রোবট নিজেই রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচার করে।

বাস্তবে তা নয়।

রোবোটিক সার্জারি মূলত রোবটের সহায়তায় সার্জারি। একজন প্রশিক্ষিত সার্জন কনসোলে বসে অস্ত্রোপচারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিয়ন্ত্রণ করেন। সার্জনের হাতের নড়াচড়া কনসোলের মাধ্যমে রোবোটিক সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত অস্ত্রোপচার যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) স্পষ্টভাবে বলেছে, রোবটের সহায়তাপ্রাপ্ত অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা সরাসরি মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অস্ত্রোপচার করতে পারে না। সাধারণত সার্জন কনসোলে বসে 3D সার্জিক্যাল ফিল্ড দেখেন এবং রোবোটিক আর্মের সঙ্গে যুক্ত অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ করেন।

অর্থাৎ বিষয়টি সহজভাবে এভাবে বোঝানো যায়—

ওপেন সার্জারি: সার্জনের হাত সরাসরি টিস্যুতে কাজ করে।

ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি: শরীরে ছোট ছিদ্র করে সার্জন ল্যাপারোস্কোপিক যন্ত্র পরিচালনা করেন।

রোবোটিক সার্জারি: সার্জন কনসোল পরিচালনা করেন এবং রোবোটিক সিস্টেম সেই নির্দেশ অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের যন্ত্র নড়াচড়া করায়।

তাই রোবট এখানে সার্জনের বিকল্প নয়। বরং সার্জনের দক্ষতাকে একটি উন্নত প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি করে।

রোবোটিক সার্জারি এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি নয়। দুটিই মূলত কম কাটাকাটির অস্ত্রোপচার-এর অন্তর্ভুক্ত।

তবে রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম প্রচলিত ল্যাপারোস্কোপির কিছু সীমাবদ্ধতা কমাতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট ত্রিমাত্রিক দৃশ্যায়ন, সূক্ষ্ম যন্ত্রের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সংযুক্ত যন্ত্র ব্যবহারের সুবিধা।

বিশেষ করে শরীরের গভীরে বা তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ ও জটিল জায়গায় কাজ করার সময় এই প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য সার্জনকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। রোবোটিক সিস্টেমে সার্জনের অনিচ্ছাকৃত সূক্ষ্ম হাত-কাঁপুনিও নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব।

টুমাই রোবটের নির্মাতা মাইক্রোপোর্ট মেডবট-এর তথ্য অনুযায়ী, সিস্টেমটিতে ত্রিমাত্রিক দৃশ্যায়ন, বহু-দিকের সঞ্চলনকৌশল এবং দেহের স্বাভাবিক কাঁপুনিসমূহ নিয়ন্ত্রণ-এর মতো প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি এখন পুরোনো বা অকার্যকর। কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করে রোগ, অস্ত্রোপচারের ধরন, জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট সার্জনের দক্ষতার ওপর।

রোবোটিক সার্জারি কি সবসময় ভালো?

এর উত্তর—না।

রোবোটিক সার্জারির প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকলেও প্রতিটি অস্ত্রোপচারে এর বাড়তি সুবিধা সমান নয়।

২০২৩ সালে সার্জিক্যাল এন্ডোস্কোপি-তে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা-তে ৪৫টি লটারিভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা এবং মোট ৭,৩৬৪ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাগুলোতে পেট ও তলপেটের অস্ত্রোপচার -এর বিভিন্ন ক্ষেত্রে রোবোটিক এবং ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতির তুলনা করা হয়েছিল।

পর্যালোচনায় সব গবেষণাতেই মৃত্যুহার-এর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ গবেষণায় জটিলতার হার, অস্ত্রোপচার পরবর্তী হাসপাতালে থাকার সময় এবং ওপেন সার্জারিতে রূপান্তর-এর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল না।

অন্যদিকে, অনেক গবেষণায় ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিতে কার্যকরী সময় এবং মোট খরচ কম পাওয়া গেছে। ৪৫টি গবেষণার মধ্যে ১৩টি মোট খরচ তুলনা করেছিল; এর ১১টিতে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি কম খরচের ছিল।

অর্থাৎ, রোবোটিক সার্জারি যে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত—এটি এক বিষয়; আর প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে সেটি যে অবশ্যই ভালো ক্লিনিকাল ফলাফল তৈরি করবে—তা আরেক বিষয়।

কিছু নির্দিষ্ট জটিল ও সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে রোবোটিক প্ল্যাটফর্মের সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু রোগী ও চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে শুধু প্রযুক্তির আধুনিকতার বদলে রোগের ধরন, সম্ভাব্য ফলাফল, সার্জনের অভিজ্ঞতা এবং খরচ বিবেচনা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রোবোটিক সার্জারি শেখার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোবটিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং ক্লিনিকাল সার্জিক্যাল দক্ষতা এক জিনিস নয়।

২০১১ সালের একটি গবেষণায় ১৫ জন মেডিকেল ছাত্রকে নিয়ে চার দিনের একটি কাঠামোগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছিল। এতে রোবোটিক সিস্টেমের মৌলিক দক্ষতায় উন্নতি দেখা যায়।

কিন্তু গবেষণাটি ছিল সীমিত সংখ্যক অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে এবং এতে রোবট পরিচালনার মৌলিক কৌশল মূল্যায়ন করা হয়েছিল। তাই এই গবেষণাকে চার দিনের মধ্যে একজন সার্জন পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল রোবোটিক সার্জারিতে দক্ষ হয়ে যান—এমন প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

বাস্তবে দক্ষতা অর্জনের জন্য রোবোটিক প্ল্যাটফর্মের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অস্ত্রোপচার পদ্ধতিতে অভিজ্ঞতা, অনুকরণ, পর্যবেক্ষণাধীন পরিস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত প্রশিক্ষণ নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এটি কতটা সাধারন মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে?

ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোবোটিক সার্জারি প্রচলিত সার্জারির তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি ব্যয়বহুল। তবে ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে খরচ কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।

এই বাড়তি ব্যয়ের পেছনে রয়েছে রোবোটিক প্ল্যাটফর্মের মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, একবার ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও রোবোটিক সার্জারির অর্থনৈতিক মূল্যায়নে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির তুলনায় বাড়তি ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হিসেবে উঠে এসেছে।

ফলে বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারি চালু হওয়া নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হলেও, এর প্রকৃত সামাজিক মূল্য নির্ভর করবে কতজন রোগী এই সুবিধা বাস্তবে গ্রহণ করতে পারবেন তার ওপর।

বাংলাদেশে রোবট-সহায়তায় চিকিৎসার অভিজ্ঞতা একেবারে নতুন নয়।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে দুই রোগীর ক্ষেত্রে রোবটের সহায়তায় অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে স্টেন্ট বসানোর ঘটনা ঘটেছিল। সেটিকে তখন দেশে প্রথম রোবোটিক অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তবে সেটি এবং ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ৩১শে আগস্টের অস্ত্রোপচার একই ধরনের চিকিৎসা নয়।

হৃদরোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তিটি ছিল স্টেন্টিং বা এনজিওপ্লাস্টি-তে রোবটের সহায়তা। আর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ব্যবহৃত হয়েছে অস্ত্রোপচারের জন্য নিবেদিত ল্যাপারোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট।

এই পার্থক্যটির কারণেই ৩১শে আগস্টের ঘটনাকে বাংলাদেশে নিয়মিত রোবট-সহায়ক অস্ত্রোপচার সেবা চালুর সূচনা হিসেবে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে।

ইউনাইটেড হেলথকেয়ার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কার্ডিয়াক সার্জারি, নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি, জেনারেল সার্জারি, গাইনোকোলজি এবং থোরাসিক সার্জারিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে একটি রোবট কেনা বা অপারেশন থিয়েটারে স্থাপন করাই রোবোটিক সার্জারি ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো তৈরি করে না।

এর সঙ্গে প্রয়োজন—

  • প্রশিক্ষিত সার্জন
  • দক্ষ অস্ত্রোপচার দল
  • চেতনানাশ এবং অস্ত্রোপচারকালীন সেবা-এর সক্ষমতা
  • পর্যাপ্ত সিমুলেশন ও তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ
  • নির্ভরযোগ্য যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ
  • রোগী নির্বাচনের সঠিক নীতি
  • নিরাপত্তা ও গুণমান-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
  • এবং দীর্ঘমেয়াদে খরচ নিয়ন্ত্রণ।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হতে পারে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের একটি অংশকে দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া। তবে সেটি কেবল প্রযুক্তি আমদানির মাধ্যমে সম্ভব হবে না। প্রয়োজন হবে দক্ষতা, নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যয়ের ভারসাম্য।

৩১শে আগস্টের দুটি অস্ত্রোপচার বাংলাদেশের সার্জিক্যাল প্রযুক্তির বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচনা।

কিন্তু এই প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু রোবট কতটা আধুনিক, কত ডিগ্রি ঘুরতে পারে বা কত উন্নত ত্রিমাত্রিক ছবি দিতে পারে—তা দিয়ে নয়।

শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হবে:

অস্ত্রোপচার কতটা নিরাপদ?

রোগীর ক্লিনিকাল ফলাফল কতটা ভালো?

সার্জন ও অস্ত্রপচারকারী দল কতটা দক্ষ?

কোন রোগীর ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি সত্যিই বাড়তি সুবিধা দেয়?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই চিকিৎসার খরচ কতটা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা যায়?

রোবোটিক সার্জারির যুগে প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি প্রযুক্তিগত মাইলফলক। তবে এই যাত্রার আসল চালিকাশক্তি রোবট নয়—দক্ষ সার্জন, প্রশিক্ষিত চিকিৎসা দল এবং সঠিক রোগীর জন্য সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *