উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে ভৌগোলিক ভঙ্গুরতা, নদীভাঙন এবং ক্রমবর্ধমান খরা মোকাবিলায় বনায়ন বৃদ্ধি এখন আর কেবল কোনো স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ নয় বরং এটি এক বাধ্যতামূলক জাতীয় ও স্থানীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ১,২৪৭.৩৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী প্রায় ১৪ লাখ ২৮ হাজার ৪০৬ জন মানুষের বসবাস। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় যেখানে মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা আবশ্যক, সেখানে লালমনিরহাটে স্থায়ী সবুজ বনাঞ্চল রয়েছে অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণ।
জেলার বুক চিরে প্রবাহিত তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও রত্নাইসহ প্রায় ১০টি নদীর সাড়ে ৪শ’ কিলোমিটার জলসীমা এবং ২৮১.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। তবে প্রতি বছর তীব্র নদীভাঙন এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে হাজার হাজার বৃক্ষ বিলীন হচ্ছে। এর বিপরীতে বনায়ন বৃদ্ধির হার অপ্রতুল হওয়ায় জেলায় পরিবেশগত বিপর্যয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তা অববাহিকার অনাবৃষ্টি, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা এবং সাম্প্রতিক সময়ের অতিমাত্রার তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে জেলায় গাছপালার ঘনত্ব চাহিদার তুলনায় অন্তত ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ কম।
পরিবেশবিদ ও নদী গবেষণা সংস্থার আঞ্চলিক সমন্বয়ক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, “লালমনিরহাটের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। চরাঞ্চল ও সীমান্তে গাছপালার ঘাটতি থাকায় মাটি ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তামাক চাষের আধিক্যে মাটির জৈব উপাদান নষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে অন্তত ৫০ লাখ নতুন গাছ লাগানো এবং সীমান্ত ও নদীবাঁধ বরাবর ‘গ্রিন বেল্ট’ বা সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক করা উচিত।”
জেলাটিতে জ্বালানি গ্যাসের সুবিধা না থাকায় ইটের ভাটা, বিভিন্ন চাতাল এবং রান্নার কাজে প্রতিনিয়ত কাঠ জ্বালানো হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনে।
সদর উপজেলার গোকণ্ডা ইউনিয়নের প্রান্তিক কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, “আগে চৈত্র-বৈশাখ মাসেও গ্রামে গাছের ছায়ায় স্বস্তি পাওয়া যেত। এখন গাছপালা কেটে ফেলার কারণে গরম সহ্য করা যায় না। তাছাড়া তামাক চাষে কাঠ পোড়াতে গিয়ে গ্রামের বড় বড় গাছগুলো শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের প্রতিটি পরিবারে যদি বাধ্যতামূলকভাবে ফলজ ও বনজ গাছ লাগানোর নিয়ম না করা হয়, তবে আগামীতে ফসল ফলানোই কঠিন হয়ে পড়বে।”
জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলা ও সরকারি কর্মসূচির বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা বন কর্মকর্তা ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি জানান, “আমরা কৃষি-বনায়ন এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় চলতি বছর চরাঞ্চল, সরকারি রাস্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছি। তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে কৃষকদের ফলজ বাগান ও লাভজনক পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল সরকারি উদ্যোগে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়; সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ আঙিনা ও ক্ষেতের আইলে গাছ লাগাতে আইনি ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নদীভাঙন রোধ, সীমান্ত এলাকার পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাসযোগ্য লালমনিরহাট নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিকদের একযোগে এ ‘সবুজ বিপ্লবে’ অংশ নিতে হবে। আজ একটি গাছ রোপণ ও রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা তৈরি না করলে আগামী প্রজন্মের জন্য এই জেলা বিরানভূমিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সাব্বির হোসেন
হাতিবান্ধা (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি