এআই ল্যাবগুলোতে এখন দার্শনিকদের কদর, কেন বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তি দুনিয়া?

এক সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কম্পিউটার বিজ্ঞানী, সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও ডেটা বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিবিদদের পাশাপাশি দার্শনিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দিচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুগল ডিপমাইন্ড, অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআই এবং মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এআই নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং মানবীয় মূল্যবোধের প্রশ্নে দার্শনিকদের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি কেবল ভাবমূর্তি রক্ষার উদ্যোগ নয়; বরং ভবিষ্যতের আরও নিরাপদ ও দায়িত্বশীল এআই তৈরির কৌশলের অংশ।

এআই মডেলকে মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো সহজ নয়। আধুনিক এআই মডেলগুলোকে মানুষের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের মূল্যবোধকে প্রযুক্তিগত নিয়মে রূপান্তর করতে হয়। কিন্তু সেই অনুবাদে সামান্য ভুলও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

অনেক সময় দেখা যায়, কোনো মডেল নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে এমন আচরণ করে, যা মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। এই ধরনের ঝুঁকি কমাতে নৈতিক যুক্তি, মূল্যবোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো বিশ্লেষণে দক্ষ দার্শনিকদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

আগে নৈতিকতা বিশেষজ্ঞরা মূলত পরামর্শ দিতেন। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে দার্শনিকরা সরাসরি এআই মডেলের আচরণ নির্ধারণে কাজ করছেন।

তারা মডেলের নীতিমালা, আচরণবিধি এবং নির্দেশিকা তৈরিতে অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ, একটি এআই কীভাবে উত্তর দেবে, কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে কিংবা কোন সীমা অতিক্রম করবে না—এসব বিষয়ে তাদের মতামত সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এআই যত উন্নত হচ্ছে, ততই নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি একদিন চেতনাশীল হতে পারে? যদি হয়, তাহলে তার প্রতি মানুষের কোনো নৈতিক দায়িত্ব থাকবে কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই গুগল ডিপমাইন্ড কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক হেনরি শেভলিনকে নিয়োগ দিয়েছে। অন্যদিকে অ্যানথ্রোপিক “মডেল ওয়েলফেয়ার” নামে একটি গবেষণা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সেখানে তাদের এআই মডেল ভবিষ্যতে কোনো ধরনের নৈতিক মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য হতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

অ্যানথ্রোপিকের রেসিডেন্ট ফিলোসোফার অ্যামান্ডা আসকেল ক্লদ এআইকে আরও সৎ, দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে কাজ করছেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ৮৪ পৃষ্ঠার একটি “ক্লদ সংবিধান” তৈরি করেছে, যেখানে এআইয়ের আচরণ নির্ধারণের নীতিমালা তুলে ধরা হয়েছে।

গুগল ডিপমাইন্ডে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আইয়াসন গ্যাব্রিয়েল এআই নৈতিকতা ও মানবীয় মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে অন্তত ১০ জন দার্শনিক বিভিন্ন গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।

এ ছাড়া কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গবেষক অ্যাটুসা কাসিরজাদেহ ডিপমাইন্ডে যোগ দিয়ে মানুষের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বা “কগনিটিভ এজেন্সি” নিয়ে গবেষণা করছেন।

এই নতুন পেশায় বেতনও উল্লেখযোগ্য। এআই নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও গভর্নেন্স–সংশ্লিষ্ট অনেক পদে বার্ষিক মূল বেতন ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

গুগল ডিপমাইন্ডের একটি এআই নৈতিকতা ও নিরাপত্তাবিষয়ক ব্যবস্থাপক পদের বার্ষিক বেতন ২ লাখ ১২ হাজার থেকে ২ লাখ ৩১ হাজার ডলারের মধ্যে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের পদে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ১০ জনেরও কম।

কিছু সমালোচকের মতে, দার্শনিক নিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উন্নত করার কৌশল হতে পারে। তবে অন্যদের মতে, যদি তারা এআইয়ের মূল্যায়ন পদ্ধতি, পুরস্কার ব্যবস্থা কিংবা নিরাপত্তা নীতিমালা তৈরিতে বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পান, তাহলে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব এখন উচ্চশিক্ষাতেও দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি ২০২৭ সালে এআই ও দর্শন বিষয়ে নতুন মেজর চালুর পরিকল্পনা করেছে।

এ ছাড়া ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলো এ বছর “অ্যাপ্লাইড অন্টোলজি” বিষয়ে নতুন ডক্টরেট কর্মসূচি চালু করেছে। এর লক্ষ্য ভবিষ্যতের এআই শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—মানবীয় মূল্যবোধ কী এবং সেটি একটি মেশিনকে কীভাবে শেখানো সম্ভব?

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল দর্শনের আলোচনা। এখন সেই দর্শনই ধীরে ধীরে এআই যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি ও মানবিক জ্ঞানের এই নতুন মিলন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও দায়িত্বশীল, নিরাপদ এবং মানুষের জন্য উপযোগী করে তুলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *