শিল্প, পাপেট ও শৈশবের স্বপ্নের এক যুগের অবসান

বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও পাপেট অঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মোস্তফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯শে জুন) সকালে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফুসফুসে সংক্রমণ ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ১৪ই  জুন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মোস্তফা মনোয়ারের প্রয়াণে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে। সহকর্মী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, তাঁর বিদায়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

বাংলাদেশের কোটি মানুষের কাছে মোস্তফা মনোয়ার সবচেয়ে পরিচিত ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-এর মাধ্যমে। আশির ও নব্বইয়ের দশকে এই অনুষ্ঠান অসংখ্য শিশুর প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে। গান, আবৃত্তি, অভিনয়, নাচ ও চিত্রাঙ্কনে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করার পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ।

আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত শিশুতোষ অ্যানিমেশন ‘মীনা’ নির্মাণেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ইউনিসেফের সহযোগিতায় নির্মিত এই ধারাবাহিকে মীনা, রাজু ও মিঠুর চরিত্র বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমতার বার্তা পৌঁছে দিতে এই কাজ বিশেষ ভূমিকা রাখে।

মোস্তফা মনোয়ারকে বাংলাদেশের আধুনিক পাপেট বা পুতুলনাট্য আন্দোলনের জনক বলা হয়। তাঁর হাত ধরে পুতুলনাট্য শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; এটি হয়ে ওঠে শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক বার্তা প্রচারের কার্যকর মাধ্যম।

তাঁর নির্মিত পাপেট চরিত্রগুলো শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী দর্শকের কাছে জনপ্রিয় ছিল। ‘মনের কথা’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটককে পাপেট রূপে উপস্থাপন করেও তিনি প্রশংসিত হন।

মোস্তফা মনোয়ার শুধু শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সাংস্কৃতিক যোদ্ধাও।

১৯৭১ সালের মার্চে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের প্রোগ্রাম প্রডিউসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি সরকারি টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন না করার সিদ্ধান্ত নেন। ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসে সম্প্রচার শেষ হয় পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন ছাড়াই। সে সময় এটি ছিল সাহসী ও প্রতীকী প্রতিবাদ।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল কাজে অংশ নেন। ভারতের শরণার্থী শিবিরে পুতুলনাটক পরিবেশন করে শিশু ও সাধারণ মানুষের মনোবল বাড়ানোর কাজও করেন। যুদ্ধকালীন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

১৯৩৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর মাগুরায় জন্মগ্রহণ করেন মোস্তফা মনোয়ার। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার কনিষ্ঠ সন্তান।

শিল্পশিক্ষায় তিনি অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেন। কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। পরবর্তী সময়ে চারুকলার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।

চিত্রশিল্প, গ্রাফিক ডিজাইন, বইয়ের প্রচ্ছদ, মঞ্চনাটকের সেট ডিজাইন এবং টেলিভিশনের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায় তিনি নতুন ধারা তৈরি করেন। শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের নকশাও তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হিসেবে পরিচিত।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া জয়নুল আবেদিন স্বর্ণপদক, সুলতান পদক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড–ডেইলি স্টার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ রাখা হবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে নেওয়া হবে। সবশেষে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

মোস্তফা মনোয়ার এমন এক শিল্পী, যিনি শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর হাতে পুতুল কথা বলেছে, রঙে ফুটে উঠেছে বাংলার প্রকৃতি, আর টেলিভিশনের পর্দায় জেগে উঠেছে অসংখ্য শিশুর স্বপ্ন।

তিনি চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি, তাঁর শিল্পভাবনা এবং তাঁর গড়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *