প্যারিসের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লুভর শুধু একটি জাদুঘর নয়, এটি বিশ্বের শিল্প, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। প্রতি বছর লাখো পর্যটক এখানে আসেন ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ দেখতে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান দর্শনার্থীর চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সাম্প্রতিক নানা সংকটের কারণে এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ফ্রান্স।
ফ্রান্স সরকার সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ-এর উদ্যোগে ‘লুভর-নিউ রেনেসাঁ’ প্রকল্পের জন্য বিজয়ী স্থপতি দলের নাম ঘোষণা করেছে। এটি গত সাড়ে তিন দশকের মধ্যে লুভরের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছে প্যারিসভিত্তিক স্টুডিওস আর্কিটেকচার প্যারিস এবং নিউ ইয়র্কের সেলডর্ফ আর্কিটেক্টস-এর যৌথ নকশা।
জার্মান বংশোদ্ভূত স্থপতি অ্যানাবেল সেলডর্ফ প্রতিষ্ঠিত সেলডর্ফ আর্কিটেক্টস ইতোমধ্যে নিউ ইয়র্কের দি ফ্রিক কাশেকশন এবং লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারী-এর উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফরাসি ল্যান্ডস্কেপ প্রতিষ্ঠান বেস ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার। তারা লুভরের ঐতিহাসিক খাদ এলাকাকে সবুজ উদ্যানে রূপান্তর করবে।
জুরি বোর্ডের মতে, নির্বাচিত নকশাটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য, নগর পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম।
পুনর্গঠন প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো মোনালিসার জন্য পৃথক প্রদর্শনী গ্যালারি নির্মাণ। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এই চিত্রকর্ম দেখতে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষ লুভরে ভিড় করেন। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুর ক্যারে চত্বরের নিচে একটি ভূগর্ভস্থ গ্যালারি নির্মাণ করা হবে। সেখানে শুধু মোনা লিসা প্রদর্শিত হবে।
দর্শনার্থীদের এই গ্যালারিতে প্রবেশের জন্য আলাদা টিকিট কিনতে হবে। এতে জাদুঘরের অন্যান্য অংশে দর্শনার্থীর চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লুভরের বর্তমান কাঁচ ও ধাতব পিরামিড প্রবেশদ্বার ১৯৮৮ সালে চালু হয়। তখন বছরে প্রায় ৪০ লাখ দর্শনার্থীর কথা মাথায় রেখে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমানে বছরে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ লুভর পরিদর্শন করেন। ফলে প্রবেশ, চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন পূর্ব প্রবেশদ্বার নির্মাণ করা হবে। এর ফলে দর্শনার্থীদের ভিড় বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন লুভর নানা সমস্যার মুখোমুখি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে জাদুঘর থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ফরাসি মুকুটের ঐতিহাসিক গহনা চুরির ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এছাড়া টিকিট জালিয়াতির কারণে জাদুঘরের প্রায় ১০ মিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে। এর পাশাপাশি ধর্মঘট, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং নিরাপত্তা ত্রুটিও কর্তৃপক্ষকে বিব্রত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা লুভরের আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ফরাসি সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নে ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় হতে পারে।
তবে ফরাসি অডিট আদালত সম্ভাব্য ব্যয় আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে। তাদের হিসাবে মোট ব্যয় ১.১৫ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
ফলে প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সময়সূচি নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
লুভর কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন নকশা দর্শনার্থীদের জন্য আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করবে। পথনির্দেশনা হবে আরও স্পষ্ট। সবুজায়ন বাড়বে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও উন্নত করা হবে।
বর্তমানে প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন লুভরের নতুন পরিচালক ক্রিস্টোফ লেরিবল্ট। তিনি চলতি বছর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প শুধু একটি জাদুঘরের সংস্কার নয়। এটি ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের নতুন ঘোষণা। কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী লুভর এখন এমন এক রূপান্তরের পথে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটিকে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও দর্শকবান্ধব করে তুলবে।