মৃত্যুর বাইরে এক শাস্তি: ‘শিশুকন্যাকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার’- ভয়াবহ পরিণতি

অস্ট্রেলিয়ার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’ মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় এসেছে এর অস্বস্তিকর, নির্মম এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপস্থাপনার কারণে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র কেবল একজন অপরাধীর শাস্তির গল্প নয়; বরং এটি প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং মানবিকতার সীমারেখা নিয়ে এক ভয়ঙ্কর প্রশ্ন তুলে ধরে।

চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র উইলি বিংহাম। এক নিষ্পাপ শিশুকন্যাকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি আদালতে দাঁড়িয়েও ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার। কারণ, দেশ থেকে ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে। ফলে তার ধারণা ছিল—জেলই হবে সর্বোচ্চ শাস্তি, আর সেই জীবন কোনো না কোনোভাবে কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব।

কিন্তু রাষ্ট্র ও আইন এবার ভিন্ন পথ বেছে নেয়।

প্রচলিত মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় সরকার নতুন ধরনের এক শাস্তি চালু করে—“ধাপে ধাপে অঙ্গচ্ছেদ”। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপরাধীর শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলা হবে, তবে তা করা হবে ব্যথাহীন অ্যানেস্থেশিয়ার মাধ্যমে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, কোন অঙ্গ কখন কাটা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয় ভুক্তভোগীর পরিবারকে।

শিশুকন্যাটির পরিবার সেই আইনে সম্মতি দেয়। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় শাস্তির অধ্যায়।

জেলের অন্ধকার কক্ষে বসে থাকা উইলির সামনে একদিন হাজির হন সরকারি কর্মকর্তা জর্জ মরটন। শান্ত স্বরে তিনি উইলিকে জানান তার ভবিষ্যৎ শাস্তির বিবরণ। মুহূর্তেই বদলে যায় উইলির চেহারা। আদালতে যে মানুষটি নির্বিকার ছিল, সে আতঙ্কে ভেঙে পড়ে। বমি করতে করতে অনুরোধ জানায়—তাকে যেন একবারে মেরে ফেলা হয়, বিষ প্রয়োগ করা হয় কিংবা ফাঁসি দেওয়া হয়। কিন্তু আইন তখন অনড়। মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ; তাই দ্রুত মৃত্যুর সুযোগও নেই।

শুরু হয় প্রথম অস্ত্রোপচার।

অ্যানেস্থেশিয়ার মাধ্যমে অবশ করে তার ডান হাত ও বাঁ পা কেটে ফেলা হয়। পুরো দৃশ্য কাচের ওপাশ থেকে প্রত্যক্ষ করে নিহত শিশুটির পরিবার। এরপর কয়েক মাস ধরে হুইলচেয়ারে বসিয়ে উইলিকে বিভিন্ন স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়। অবাধ্য ও অপরাধপ্রবণ কিশোরদের সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে বলা হতো বক্তৃতা দিতে—যাতে তার ভয়াবহ পরিণতি দেখে অন্য কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।

তবু প্রথমদিকে উইলির ভেতরে কিছু জেদ ও মানসিক শক্তি টিকে ছিল। সে কথা বলত, কখনো হাসতও।

কিন্তু শাস্তি তখনও শেষ হয়নি।

পরবর্তী কয়েক মাসে একে একে কেটে ফেলা হয় তার বাঁ হাত, ডান পা, একটি কিডনি এবং ফুসফুসের অংশ। ধীরে ধীরে তার শরীর পরিণত হতে থাকে এক বিকলাঙ্গ মাংসপিণ্ডে। ভয়াবহ কান্না, আতঙ্ক আর অসহায়তা দেখে ভুক্তভোগী পরিবারের অনেক সদস্যও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকেন। তবে শিশুটির বাবা প্রতিবারই উপস্থিত থাকতেন। নির্বিকার চোখে কাচের ওপাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্রোপচার দেখতেন এবং অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করতেন।

শুধু তাই নয়, প্রতিটি অস্ত্রোপচারের ভিডিও রেকর্ড করে পরে উইলিকেও দেখানো হতো।

এদিকে বাইরে শুরু হয় তীব্র জনমত। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এই শাস্তিকে অমানবিক বলে প্রতিবাদ জানায়। কেউ বলছিল দ্রুত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক, কেউ বলছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই যথেষ্ট। কিন্তু রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের জন্য “সহজ মৃত্যু” বা “আরামদায়ক কারাজীবন”—কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয় বলে দেখানো হয় চলচ্চিত্রে।

পাঁচ মাস পর আসে আরও ভয়াবহ অধ্যায়।

উইলিকে জানানো হয়, এবার তার যৌনাঙ্গ অপসারণ করা হবে। এই ঘোষণার পর সে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। কান্নায়, চিৎকারে, অনুনয়ে সে মুক্তি চায়। কিন্তু কাচের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির বাবার চোখে তখন শুধুই প্রতিশোধের আগুন। তিনি ঠান্ডা মাথায় সম্মতির ইঙ্গিত দেন। অ্যানেস্থেশিয়ার ইঞ্জেকশন শরীরে প্রবেশ করে, আর চিরতরে শেষ হয়ে যায় উইলির পুরুষত্ব।

এই অস্ত্রোপচারের পর যেন তার ভেতরের মানুষটিও মারা যায়। সে আর কখনো কথা বলেনি। মুখে আর কোনো অনুভূতির ছাপও দেখা যায়নি। বেঁচে থেকেও সে যেন এক জীবন্ত মৃতদেহে পরিণত হয়।

কিন্তু নির্মমতা তখনও থামেনি।

পরবর্তী অস্ত্রোপচারে তার দুই কান, নাক এবং জিহ্বার অগ্রভাগ কেটে ফেলা হয়। শরীরের অবশিষ্ট চামড়ার অংশ লেজার দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন উইলি যেন যন্ত্রণারও বাইরে চলে গেছে। তার নিজের বলে আর কোনো ইচ্ছাশক্তি অবশিষ্ট ছিল না। ভেতরে ভেতরে সে শুধু মৃত্যুকেই চাইছিল।

অপারেশন টেবিলে পড়ে থাকা সেই বিকৃত দেহের দিকে তাকিয়ে অবশেষে সন্তুষ্ট হন শিশুটির বাবা। পরবর্তী অস্ত্রোপচারে উইলির হৃদপিণ্ড বা মস্তিষ্কে হস্তক্ষেপ করা হতে পারত, যা তার মৃত্যুর কারণ হতো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি আর অনুমতি দেন না। তিনি জানান—এতেই তিনি সন্তুষ্ট।

ফাইলে স্বাক্ষর করে তিনি অস্ত্রোপচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকান উইলির দিকে।

চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্য সবচেয়ে ভয়াবহ।

উইলি এখন জেলের সর্বোচ্চ তলার একটি কক্ষে বন্দি। সেখানে সারাক্ষণ জ্বলতে থাকে তীব্র আলো; অন্ধকারেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। সে আর শুনতে পারে না, ঘ্রাণ নিতে পারে না, স্বাদ অনুভব করতে পারে না। নড়াচড়া করার ক্ষমতাও নেই। হুইলচেয়ারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে আটকে থাকা এক নিথর মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে সে।

সারাদিন শুধু সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তবে মাসের শেষ সপ্তাহে তার এই জড়দেহের সামান্য নড়াচড়া হয়। সরকারি কর্মকর্তা জর্জ মরটন তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে বিভিন্ন স্কুলে নিয়ে যান। অবাধ্য ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড় করানো হয় সেই বিকৃত, ভয়ঙ্কর অবয়বকে—অপরাধের এক জীবন্ত স্মারক হিসেবে।

শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায়। তাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয় শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ভয়াবহ পরিণতির ধারণা।

‘দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’ মূলত একটি কাল্পনিক গল্প হলেও এটি দর্শকের সামনে কঠিন এক নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের সীমা কোথায়? একজন ভয়াবহ অপরাধীর জন্য রাষ্ট্র কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? আর প্রতিশোধ কি কখনো সত্যিকারের শান্তি এনে দিতে পারে?

এই কারণেই চলচ্চিত্রটি শুধু একটি শর্ট ফিল্ম নয়; বরং মানবিকতা, আইন এবং প্রতিহিংসার সীমারেখা নিয়ে নির্মিত এক অস্বস্তিকর কিন্তু শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *