গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দাবিতে রাজধানীতে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, উজানে পানি প্রত্যাহার ও দুর্বল কূটনৈতিক কাঠামোর কারণে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ক্রমেই পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
শনিবার (২৫শে এপ্রিল) সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব-এর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এ সেমিনারের আয়োজন করে নোঙর ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন অব এডুকেশনাল ট্রান্সপারেন্সি। অনুষ্ঠানে “গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি এবং অভিন্ন নদীতে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার” শীর্ষক আলোচনা এবং আন্তঃসীমান্ত নদী বিষয়ক একটি সংকলনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
বক্তারা জানান, ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা ৫৭টি অভিন্ন নদীর ওপর উজানে বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের মতে, ফারাক্কা পয়েন্টে পানি বণ্টনের যে হিসাব রয়েছে, তা কার্যকর হয় না যদি তার আগেই উজানে পানি সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে ১৯৯৬ সালের চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সেমিনারে জানানো হয়, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। বক্তারা চুক্তি নবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, শুধু গঙ্গা নয়—সব অভিন্ন নদীর জন্য একটি সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও উজানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে চুক্তি কার্যকর রাখতে এবং ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে গেলে যেমন নাব্যতা কমে যায়, তেমনি বর্ষায় অতিরিক্ত পানির চাপ অবকাঠামোর ক্ষতি করে। তাই নদী শাসন ও ড্রেজিংকে উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে নোঙর ট্রাস্টের সভাপতি সুমন শামস বলেন, সংকট শুধু আন্তর্জাতিক নয়, দেশের অভ্যন্তরেও রয়েছে। নদী দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত ড্রেজিং এবং খাল-নালার অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তিনি বলেন, “অভিন্ন নদী মানে অভিন্ন দায়”—এই ধারণা সামনে রেখে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, পাশাপাশি দেশের ভেতরের ব্যবস্থাপনাও ঠিক করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বেসিনভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় এবং ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত করার মতো বিষয়গুলো নতুন চুক্তিতে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এস এম আবু হোরায়রা বলেন, চুক্তি নবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
বক্তারা সতর্ক করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে মরুকরণ বাড়বে এবং নদীনির্ভর জনগোষ্ঠী বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক নদী আইন ও ন্যায্য ব্যবহারের নীতিকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে আরও কৌশলগত অবস্থান নিতে হবে—নয়তো ভবিষ্যতে পানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে।