দেশের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে ৬৪ জেলার সম্ভাবনাময় স্থানগুলো চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো, ইকো-ট্যুরিজমের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান নিরূপণে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (১২ই আগস্ট) সকালে রাজধানীর পর্যটন ভবনে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড আয়োজিত ‘ইকো-ট্যুরিজম প্রসারে সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা জানানো হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, এমপি। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার, এনডিসি। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুর রউফ, এনডিসি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও বাংলাদেশের পর্যটন খাতে প্রত্যাশিত উন্নয়নের নজির তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাংলাদেশকে একটি ‘ট্যুরিজম হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই পর্যটন খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। এ জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পর্যটন খাতের উন্নয়নে অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে বেসরকারি খাতের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ জন্য প্রতি মাসে বেসরকারি অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তার ভাষায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে তথ্যের ঘাটতি থাকলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে সেই ঘাটতি কমাতে চায় সরকার।
মন্ত্রী জানান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের অংশ হিসেবে দেশের কয়েকটি গ্রামকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মধ্যে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর গ্রামের মতো ‘এসডিজি ভিলেজ’কে পর্যটন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য, এ ধরনের সম্ভাবনাময় স্থানগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪ জেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ও গ্রামীণ বৈশিষ্ট্যকে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে তুলে ধরতে চায় সরকার।
সেমিনারে সচিব ফাহমিদা আখতার বলেন, পর্যটন খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি। এ সমস্যা কাটাতে ইতোমধ্যে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট (টিএসএ)-এর কাজ শুরু হয়েছে।
টিএসএ-এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান, কর্মসংস্থান, পর্যটকদের ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।
সচিব বলেন, একই সঙ্গে ইকো-ট্যুরিজম নীতিমালা প্রণয়নের কাজও চলছে। অতীতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পর্যটন খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এ সমন্বয়হীনতা দূর করে পর্যটন খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ইকো-ট্যুরিজমের মূল ধারণা হলো প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির ক্ষতি না করে পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশের পাহাড়, বন, নদী, হাওর, উপকূল, গ্রাম ও জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে এ ধরনের পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অপরিকল্পিত পর্যটন প্রকৃতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। পরিবেশদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের অভাব এবং পর্যটন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা—এসব বিষয় ইকো-ট্যুরিজমের বিকাশে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেমিনারে বাংলাদেশের ইকো-ট্যুরিজমের বর্তমান অবস্থা, এর গুরুত্ব, উন্নয়নের পথে চ্যালেঞ্জ, সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনা এবং করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, সঠিক তথ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পর্যটনকে শুধু দর্শনীয় স্থানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি টেকসই অর্থনৈতিক খাতে পরিণত করা সম্ভব—সেমিনারের আলোচনায় এ বিষয়টিই গুরুত্ব পায়।