শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়তে বাবা-মায়ের যে ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি

রুবাবা জাফরীন

সন্তানের যেকোনো সমস্যায় দৌড়ে গিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াটা বাবা-মাদের অত্যন্ত স্বাভাবিক ও ভালোবাসাপূর্ণ প্রবৃত্তি। আমরা চাই না আমাদের সন্তান কোনো কষ্ট, ব্যর্থতা বা হতাশার মুখোমুখি হোক। কিন্তু শিশু মনোবিদদের মতে, এই অতিরিক্ত যত্ন বা ‘সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার তাড়া’ শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী নিউজউইক-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিশু মনোবিদ এবং প্যারেন্টিং এক্সপার্ট জিল হারট্রিক এমনই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন, যা প্রতিটি বাবা-মাকে ভাবতে বাধ্য করবে।

হারট্রিকের মতে, বাবা-মাদের করা সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর মধ্যে একটি হলো—শিশু কোনো সমস্যায় পড়ার সাথে সাথেই তা সমাধান করে দেওয়া বা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা (যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Rescuing’ বা অতিরিক্ত উদ্ধারকর্তা সাজা বলা হয়)।

তিনি বলেন, “যখন বাবা-মা সন্তান বিচলিত হওয়ার মুহূর্তেই সমস্যার সমাধান করে দেন বা পথ সহজ করে দেন, তখন তারা শিশুর নিজেদের সমস্যা সমাধানের অন্তর্নিহিত ইচ্ছাকেই দুর্বল করে দেন।”

যখন শিশুদের স্বাধীনভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তারা নিজেকে বিশ্বাস করতে শেখে এবং নিজের অর্জন নিয়ে গর্ব বোধ করে। কিন্তু বাবা-মা অতিরিক্ত মানিয়ে নেওয়া বা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে শিশুদের কঠিন মুহূর্তগুলো পার করে ওঠার সুযোগটি কেড়ে নেওয়া হয়।

বাবা-মা সাধারণত সহযোগিতার উদ্দেশ্যেই এমনটি করেন, কিন্তু শিশুরা তা ভিন্নভাবে গ্রহণ করতে পারে। হারট্রিকের মতে, এসব মুহূর্তে শিশুর মনে এমন বার্তা তৈরি হয়—’আমার বাবা-মা বিশ্বাস করে না যে আমি এটা সামলাতে পারব’ অথবা ‘এটা আমার পক্ষে খুব কঠিন’।

মনে রাখা জরুরি, শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তীতে সেই সংগ্রামে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে।

ধরা যাক, আপনার সন্তান জুতার ফিতে বাঁধতে পারছে না অথবা ফুটবল খেলতে গিয়ে বলটি ঠিকমতো কিক করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে গিয়ে সমস্যাটি সমাধান করে দেওয়া বা অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক আচরণ করাই হলো সেই ভুল।

আরেকটি উদাহরণ: যদি আপনার সন্তান স্কুলে হোমওয়ার্ক নিতে ভুলে যায়, তবে শিক্ষককে ইমেইল করে তা ব্যাখ্যা করার প্রলোভন সংবরণ করুন। এর পরিবর্তে, শিশুকে সেই ভুলের পরিণতি ভোগ করতে দিন। হারট্রিক বলেন, “এই মুহূর্তগুলো শিশু এবং বাবা-মা উভয়ের জন্যই কঠিন হতে পারে, তবে আত্মবিশ্বাসী এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী শিশু গড়ে তোলার জন্য এগুলো অপরিহার্য।”

শিশুকে সংগ্রাম করতে দেওয়া মানে তাকে একা ফেলে দেওয়া নয়। হারট্রিক বাবা-মাদের কিছু কার্যকর বিকল্প পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন:

১. সহানুভূতি ও উৎসাহের সমন্বয়: সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করে দেওয়ার বদলে সহানুভূতি ও উৎসাহ দিন। শিশুকে বলুন, “আমি জানি এটা কঠিন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তুমি এই কঠিন কাজটি সামলাতে পারবে।”

২. অস্বস্তিতে পাশে থাকা : শিশুকে নতুন বা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা আছে তা বুঝতে সাহায্য করুন। একজন সহায়ক বাবা-মা হিসেবে আপনি শিশুর পাশে বসে থাকতে পারেন, তাকে মানসিক জোর দিতে পারেন, কিন্তু তার সমস্যাটি তার হয়ে সমাধান করে দেবেন না।

৩. নির্দিষ্ট প্রশংসা: শিশু যখন কোনো কঠিন মুহূর্ত কাটিয়ে ওঠে, তখন তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দিন। “নির্দিষ্ট এবং লেবেলযুক্ত প্রশংসা”  শিশুর আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করে এবং বাবা-মার বিশ্বাসের বার্তাটি পুনর্ব্যক্ত করে।

সন্তানকে ভালোবাসা মানে তাকে সব সময় বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত রাখা নয়, বরং তাকে নিজেই বিপদ মোকাবিলার সাহস ও দক্ষতা শেখানো। জিল হারট্রিকের এই পরামর্শ বাবা-মাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—সন্তানের পাশে থাকুন, কিন্তু তার হয়ে লড়াই করে দেবেন না। কারণ, ছোটখাটো সংগ্রামের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে প্রকৃত ও টেকসই আত্মবিশ্বাস।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *