ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা কোথায়?

বিজয় মজুমদার

সে অনেক দিন আগের কথা। সময়টা ১৯৮৩ সাল। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। নিয়মিত দিনাজপুর শিশু একাডেমিতে যেতাম।

তখন শিশু একাডেমির সংগঠক ছিলেন মিসেস ইয়াসমিন জামান। শিশুদের জন্য অন্তঃপ্রাণ এই মানুষটিকে আমরা সবাই ‘আপা’ বলে ডাকতাম।

একদিন তিনি আমাদের একটি ছোট্ট লেখা লিখতে দিলেন।

বিষয়— ‘তোমরা বড় হয়ে কে কী হতে চাও?’

কে কী হতে চাই—এই প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য নির্ধারিত সময় যথেষ্টই ছিল। কিন্তু আপা এর সঙ্গে একটি ছোট্ট শর্ত জুড়ে দিলেন। শুধু কী হতে চাই তা লিখলেই হবে না, কেন হতে চাই সেটিও লিখতে হবে।

এর সঙ্গে তিনি আরও বললেন, যে সবার আগে লেখা জমা দেবে, তার জন্য থাকবে একটি পুরস্কার।

কী হতে চাই? কেন হতে চাই?

সেদিন আমি প্রথম পুরস্কারটি পেয়েছিলাম।

যদিও ভুল বানানে লিখেছিলাম, ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।’

কেন হতে চাই?

আপা আমার লেখা হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘বিজয় সবার আগে জমা দিয়েছে। সে কী লিখেছে?’

তিনি পড়ে শোনালেন—
‘সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কারণ বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ারের খুব অভাব।’

আমার সেই ছোটবেলায় এবং এখনো ইঞ্জিনিয়ারদের—বিশেষ করে বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট থেকে পাস করা প্রকৌশলীদের—অনেক মেধাবী ও বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমাজে তাদের সম্মানও অনেক। মফস্বল শহরের বিয়ের বাজারেও ইঞ্জিনিয়ারদের এখনো ভালো পাত্র হিসেবে দেখা হয়।

আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলাম মূলত তাঁদের এই সামাজিক সম্মানের কারণে। সবাই জানে, ইঞ্জিনিয়ার হলে ভালো আয় করা যায়। অনেক সময় মেয়ের বাবা-মা পর্যন্ত এমন পাত্রের সন্ধানে বাড়িতে ঘটক পাঠান।

এরপর একে একে সবাই নিজের লেখা জমা দিল।

আপা সবার লেখা পড়ে শোনাতে শুরু করলেন।

উপস্থিত সবার মধ্যে যাদের লেখা নিয়ে আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি, তারা ছিলেন দিনাজপুর গার্লস স্কুলের দুই ছাত্রী।

একজন তখন সেই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির প্রথম ছাত্রী। অন্যজনও ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন মফস্বলের একটি উচ্চবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী পরিবারের সন্তান।

দুজনের উত্তর ছিল একই।

দুজনেই ডাক্তার হতে চায়।

কেন?

কারণ সমাজে ডাক্তারদের অনেক প্রয়োজন। তারা ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চায়।

আমাদের মধ্যে একজনের উত্তর ছিল একেবারেই আলাদা।

সে লিখেছিল, বড় হয়ে সে ‘চৌধুরী’ হতে চায়।

কারণ?

চৌধুরীদের অনেক ধনসম্পত্তি থাকে।

সবার লেখা পড়া শেষ হলে আপা বললেন, ‘তোমরা সবাই খুব সুন্দর লিখেছ। বাংলাদেশে ভালো মানের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষকের অভাব আছে। কিন্তু তোমরা সবাই একটি বিষয় লিখতে ভুলে গেছ।’

আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম।

আপা বললেন, ‘আমাদের দেশে ডাক্তার আছে, ইঞ্জিনিয়ার আছে। তোমরা কি কেউ ভালো মানুষ হতে চাও না?’

আমরা সবাই একসঙ্গে বললাম, ‘হ্যাঁ, আপা, চাই।’

আপা বললেন, ‘তোমরা সেটা কিন্তু কেউ লেখোনি। তোমরা যে যাই হও, যেন উন্নত চিন্তার মানুষ হও। সৎ মানসিকতার মানুষ হও। এটাই তোমাদের কাছে আমার চাওয়া।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থে ভালো মানুষের অনেক অভাব। আশা করি, তোমরা বড় হয়ে সৎ ও সুনাগরিক হবে।’

এটি এখন থেকে প্রায় বিয়াল্লিশ বছর আগের কথা।

আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারিনি।

সেটা না হয় নাই হলো।

কিন্তু এখন নিজেকে যখন প্রশ্ন করি—আমি কি মানুষ হয়েছি?

সুস্পষ্ট উত্তর, ‘না।’

যদি আরও নির্দিষ্ট করে প্রশ্ন করি, আমি কি ভালো মানুষ হয়েছি?

সেটার উত্তরও হচ্ছে, ‘না।’

আমি কি সৎ মানুষ?

এর উত্তরও, ‘না।’

অনেকেই হয়তো বলবেন, ‘এ আপনার বিনয়। আপনি তো অনেক সহজ-সরল মানুষ।’

আমি বলব, এগুলো সবই আমার মুখোশ। আমার ব্যর্থতাকে ঢাকার একটি প্রচেষ্টা।

রাষ্ট্রের মঙ্গলে, দেশের ভালো কাজে আমার অবদান—‘শূন্য।’

আমি সৎ, কারণ আমার অসৎ হওয়ার জায়গা নেই। আমি সৎ, কারণ অসৎ হওয়ার মতো সৎ সাহসও আমার নেই।

আমি বাংলাদেশের একজন প্রথম শ্রেণির নাগরিক।

আমার এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার সার্টিফিকেটের।

আমি বাংলাদেশের সরকারি স্কুল ও কলেজে পড়েছি। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছি এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি।

আমার শিক্ষাজীবনের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের বড় অবদান রয়েছে। সরকারের ভর্তুকির অর্থে পরিচালিত সরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি শিক্ষা লাভ করেছি।

কিন্তু এত বছর পরও আমি এমন শিক্ষা নিতে পারিনি যে, আমার সরকারকে কর দেওয়া আমার অন্যতম দায়িত্ব।

আমার শিক্ষা কারিকুলাম আমাকে সৎ হতে শেখায়নি। আমাকে উদার হতে শেখায়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে—এই বোধও আমার শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠেনি।

আমাদের যাপিত জীবনের বাস্তবতা কী, একজন নাগরিক হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী—সেটিও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

কাগজে-কলমে নাগরিক দায়িত্ব, সামাজিক মূল্যবোধের বিষয় হয়তো ছিল। কিন্তু শিক্ষা সমাপ্তির পর বাস্তব জীবনে সেই শিক্ষা আমরা ধরে রাখতে পারিনি।

এর ফল কী?

আমরাই সরকারি সম্পদ নষ্ট করি। আমরাই অনেক সময় সরকারি সম্পদ লুট করি। রাষ্ট্রের সম্পদকে নিজের সম্পদ হিসেবে রক্ষা করার মানসিকতা আমাদের মধ্যে তৈরি হয় না।

এসব শেখানো প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।

কিন্তু একটি বিষয় এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই—আমরা সৎ মানুষ তৈরি করতে পারছি না।

কারণ উন্নত রাষ্ট্রের তালিকায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে থাকলেও দুর্নীতির তালিকায় আমাদের অবস্থান বারবার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া বিষয়গুলোর একটি হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।

কিন্তু এত পরিবর্তন, এত সংস্কারের পরও এমন কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি, যা নিশ্চিত করতে পারে—একটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের মাধ্যমে সে একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

যারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন, নীতিনির্ধারণ করছেন, তাদের এই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।

শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা?

শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী তৈরি করা?

নাকি শিক্ষার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো একজন ভালো মানুষ তৈরি করা?

আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে।

শুরুতেই বলেছিলাম, ৪২ বছর আগের একটি ঘটনার কথা।

সেই ঘটনায় আমার পাশাপাশি আরও তিনজনের কথা উল্লেখ করেছিলাম।

তাদের পরবর্তী জীবনের গল্পও বলি।

যে দুজন সেদিন ডাক্তার হতে চেয়েছিল, তাদের কেউই ডাক্তার হয়নি।

তবে দ্বিতীয়জন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর শিক্ষা শেষ করে বর্তমানে আমেরিকায় প্রবাস জীবন কাটাচ্ছে।

আর প্রথমজন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে ডিগ্রি অর্জন করলেও পরবর্তী সময়ে একজন পরিচিত লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি আবার বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগারের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

নিঃসন্দেহে ইয়াসমিন জামান আপার সেই শিক্ষা কাজে লেগেছে।

তারা ডাক্তার হতে পারেনি, কিন্তু ভালো মানুষ হতে পেরেছে।

আর তৃতীয়জন—যে বড় হয়ে ‘চৌধুরী’ হতে চেয়েছিল, কারণ চৌধুরীদের অনেক ধনসম্পত্তি থাকে—সেও শেষ পর্যন্ত চৌধুরী হতে পারেনি।

তবে জীবনের এক পর্যায়ে সে পথ হারিয়েছিল।

অল্প বয়সেই সে ট্র্যাকচ্যুত হয়ে গিয়েছিল। একসময় মানুষ তাকে বেশ ভয়ও পেত।

প্রায় ৩৫ বছর পর তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।

তখন তিনি একটি স্টোরের মালিক।

এরপর তিনি সেই জীবন ছেড়ে দিয়ে ধর্মীয় জীবনযাপন শুরু করেছেন।

আমি বিশ্বাস করি, এখন তিনি একজন সৎ মানুষ।

বিয়াল্লিশ বছর আগে দিনাজপুর শিশু একাডেমির ছোট্ট একটি কক্ষে ইয়াসমিন জামান আপা আমাদের যে প্রশ্নটি করেছিলেন, সেটি আজও আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে আছে।

‘তোমরা কি কেউ ভালো মানুষ হতে চাও না?’

আজ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন এই প্রশ্নটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

আমাদের প্রয়োজন শুধু দক্ষ পেশাজীবী নয়; প্রয়োজন সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও বিবেকবান মানুষ।

কারণ একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয় শুধু বড় বড় ভবন, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়।

একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয় তার মানুষের চরিত্র, সততা ও দায়িত্ববোধ।

আর সেই মানুষ তৈরির প্রথম জায়গা হলো—শিক্ষা ব্যবস্থা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *