তাইওয়ান প্রেসিডেন্টের ছেলের ওপর নজরদারির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে এক নারী গ্রেপ্তার

লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এফবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার ওয়ানইং ঝ্যাং

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওয়ানইং ঝ্যাং নামে ৩৪ বছর বয়সী এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। অভিযোগ, তিনি চীনা সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের ছেলের পরিবারকে নজরদারি করেছিলেন এবং তাঁদের ছবি, ভিডিও ও গাড়ির নম্বরসংক্রান্ত তথ্য চীনা কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ৪ঠা অক্টোবর চীনে যাওয়ার বিমানে ওঠার আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা প্রকাশ করে।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঝ্যাং যুক্তরাষ্ট্রে চীনা সরকারের অনিবন্ধিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।

ওয়ানইং ঝ্যাং ‘হেদার ঝ্যাং’ নামেও পরিচিত। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিন শহরের বাসিন্দা এবং পেশায় রিয়েল এস্টেট এজেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশি সরকারের অনিবন্ধিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঝ্যাং বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসে পড়াশোনা করেছিলেন। মার্কিন তদন্তকারীদের হলফনামায় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চীনের গোয়েন্দা কাঠামোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারীদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ঝ্যাং চীনা সরকারের অন্তত দুই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। তাঁদের একজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই। পরে ওই পরিচিতির সূত্র ধরে আরেক চীনা কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন তদন্তকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ঝ্যাং ও তাঁর এক সহযোগী লাস ভেগাস থেকে সিয়াটলে যান। সেখানে একটি কালো নিসান গাড়ি ভাড়া করে তাঁরা তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের ছেলে লাই টিং-ইউর বাড়ির আশপাশে যান।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, ওই দিন লাই টিং-ইউ, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের শিশুসন্তান বাড়িতে ফেরার সময় তাঁদের ভিডিও ধারণ করা হয়। ঝ্যাং পরে চীনা কর্মকর্তাদের কাছে নজরদারিসংক্রান্ত তথ্য পাঠিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঝ্যাং তাঁর যোগাযোগকারীদের বার্তায় লক্ষ্য ব্যক্তিকে দেখার কথা জানান এবং ভিডিও ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তদন্তকারীদের মতে, এই তথ্যগুলো নিছক ব্যক্তিগত যোগাযোগ নয়; বরং পরিকল্পিত নজরদারির অংশ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, তাইওয়ানের উচ্চপর্যায়ের এক সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের অবস্থান ও ব্যক্তিগত তথ্য ভবিষ্যতে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করা হতে পারত। তবে চীনা সরকারের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা অভিযোগের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

২০২৬ সালের ৪ঠা অক্টোবর ঝ্যাং যখন লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চীনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন এফবিআই তাঁকে গ্রেপ্তার করে। একই সময়ে তাঁর ক্যালিফোর্নিয়ার বাসায় তল্লাশি চালানো হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫ই  অক্টোবর তাঁকে লস অ্যাঞ্জেলেসের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে তিনি নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বুঝতে পেরেছেন বলে জানান। প্রাথমিক শুনানিতে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো বিদেশি সরকারের অনিবন্ধিত প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা। অভিযোগটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইনে শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

তবে মামলার অভিযোগ, তদন্তকারীদের দাবি এবং আদালতে প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই বিচারিক সিদ্ধান্তের আগে ঝ্যাংকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। অন্যদিকে, তাইওয়ানের বর্তমান সরকার দ্বীপটির নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ নিয়ে বেইজিং ও তাইপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চলছে।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের পরিবারকে ঘিরে এই অভিযোগ সে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, কোনো রাজনৈতিক নেতার পরিবারের সদস্যদের ওপর নজরদারি চালিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হলে তা নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

মার্কিন তদন্তকারীদের আশঙ্কা, এ ধরনের তথ্য সম্ভাব্য সংঘাতের সময় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কাজে লাগানো হতে পারে। তবে এই আশঙ্কা তদন্তকারীদের ব্যাখ্যা; চীনা সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বলেছে, বিদেশি সরকারের হয়ে গোপনে কাজ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবারের ওপর নজরদারির অভিযোগ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।

তাইওয়ানের পক্ষ থেকেও ঘটনাটির নিন্দা জানানো হয়েছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের দপ্তর এ ঘটনাকে সীমান্ত অতিক্রমকারী নিপীড়নের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই পরিভাষা দিয়ে সাধারণত কোনো সরকার বা তার সহযোগীদের নিজ দেশের সীমানার বাইরে অবস্থানরত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ভয় দেখানো, নজরদারি করা কিংবা চাপ দেওয়ার অভিযোগ বোঝানো হয়।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তাইওয়ান, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত রয়েছে। তাইওয়ান ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়।

প্রতিবেদনে ঝ্যাং ও তাঁর স্বামীর রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এবং তাঁদের সম্পত্তি বিক্রির বিষয়টিও উঠে এসেছে। তাঁদের বাড়ি বিক্রির মূল্য ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেশীদের মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে সম্পত্তির মূল্য, ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা কোনো বাড়ি বিক্রির ঘটনা নিজে থেকে গুপ্তচরবৃত্তির প্রমাণ নয়। এসব তথ্যের সঙ্গে কথিত নজরদারির সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে তদন্তে পাওয়া নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

এই ঘটনা বিদেশি সরকারের হয়ে গোপন তৎপরতার অভিযোগ, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের সীমানার বাইরে নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আধুনিক কূটনীতিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু সামরিক শক্তি বা প্রকাশ্য কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তথ্য সংগ্রহ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে একটি নির্দিষ্ট মামলার অভিযোগকে পুরো দেশের জনগণ বা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখা উচিত নয়। একইভাবে, তদন্তকারীদের অভিযোগ এবং আদালতে প্রতিষ্ঠিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও এফবিআইয়ের তদন্তের মাধ্যমে মামলাটির আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। আপাতত নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ওয়ানইং ঝ্যাংকে বিদেশি সরকারের অনিবন্ধিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের পরিবারের ওপর নজরদারির অভিযোগটি মামলার কেন্দ্রে রয়েছে।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, রয়টার্স ও ব্লুমবার্গ।

 

 

আরো পড়ুন : তাইওয়ানের গণতন্ত্রকে জিম্মি করে রাখা চারটি মুখ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *