তাইওয়ানকে ঘিরে চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণত সামরিক নিরাপত্তা, তাইওয়ান প্রণালি কিংবা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে—তাইওয়ানের গণতন্ত্র কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে।
২৩ মিলিয়নের বেশি মানুষের এই স্বশাসিত দ্বীপে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করে। কিন্তু একই সময়ে চীনের সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, তথ্যযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা তাইওয়ানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করছে।
এই চাপকে তাইওয়ানের জন্য শুধু নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। কারণ সামরিক শক্তি ব্যবহার না করেও একটি গণতন্ত্রের জনগণকে ভয় দেখানো, অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলা, তথ্যের পরিবেশকে বিভ্রান্ত করা কিংবা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সীমিত করে দেওয়া সম্ভব।
তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক তৎপরতা গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধবিমান, নৌবাহিনী ও অন্যান্য সামরিক সম্পদের উপস্থিতি তাইওয়ানের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে ক্রমাগত প্রভাবিত করছে।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয় না। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত স্বশাসিত ভূখণ্ড হিসেবে পরিচালনা করছে। এই মৌলিক বিরোধই দুই পক্ষের উত্তেজনার কেন্দ্রে।
২০২৬ সালেও সামরিক চাপ কমেনি। আগস্টে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলের কাছে চীনা নৌবাহিনী ও ইন্দোনেশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজের যৌথ মহড়া নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। তাইওয়ান ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও উসকানিমূলক বলে সমালোচনা করেছে। ইন্দোনেশিয়া অবশ্য বলেছে, এটি ছিল প্রচলিত ‘পাসিং এক্সারসাইজ’, যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক মহড়া নয়।
তবে এ ধরনের ঘটনার প্রভাব শুধু সামরিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন একটি দেশের নাগরিকরা নিয়মিত সম্ভাব্য সংঘাতের কথা ভাবতে বাধ্য হন, তখন তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও নিরাপত্তা একটি বড় বিষয় হয়ে ওঠে।
তাইওয়ান এখন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পথে হাঁটছে। ২০২৭ সালের জন্য দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন তাইওয়ান ডলার ছাড়িয়ে জিডিপির ৩ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধের সম্ভাবনা তাইওয়ানের অর্থনীতি, বাজেট এবং রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।
তাইওয়ানের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে তাইওয়ান গভীরভাবে যুক্ত। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু তাইওয়ানের ওপর পড়বে না; বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
চীন অতীতে তাইওয়ানের বিভিন্ন পণ্যের ওপর বাণিজ্যিক সুবিধা প্রত্যাহার বা আমদানি সীমিত করার মতো ব্যবস্থা নিয়েছে। এর পেছনে অর্থনৈতিক যুক্তি থাকলেও, তাইওয়ানের দৃষ্টিতে এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক চাপ তৈরির অংশও হতে পারে।
এখানেই সমস্যাটি জটিল। কোনো দেশের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপ না করেও বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ বা নির্দিষ্ট পণ্যের বাজারকে চাপ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
তাইওয়ানের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে—চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কীভাবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখা যায়।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো জনগণের স্বাধীনভাবে তথ্য পাওয়া এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এই ব্যবস্থাটিই নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে।
ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর ভিডিও, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণা এবং রাজনৈতিক গুজব—এসবের মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করা সম্ভব।
তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই চীনা প্রভাব, সাইবার হামলা এবং তথাকথিত ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’ নিয়ে সতর্ক। দেশটির সরকার মনে করে, এসব কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা দুর্বল করা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দরকার। তাইওয়ানের রাজনৈতিক বিভাজনের সবকিছুকে বাইরের হস্তক্ষেপ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাইওয়ানের নিজস্ব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর মতভেদ রয়েছে।
বরং বাইরের তথ্যযুদ্ধের বড় ঝুঁকি হলো—বিদ্যমান বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলা।
তাইওয়ানের আরেকটি বড় দুর্বলতা তার আন্তর্জাতিক অবস্থান।
চীন তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশকে ‘এক চীন’ নীতি অনুসরণের জন্য চাপ দেয়। এর ফলে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের মতে, চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক পরিসর সীমিত করার চেষ্টা করছে। ২০১৬ সালের শেষ দিক থেকে একাধিক দেশ তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে; এর পেছনে চীনের অর্থনৈতিক প্রণোদনাও ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর প্রভাব শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়।
২০২৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ৭৯তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনেও তাইওয়ানের অংশগ্রহণ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। তাইওয়ান অভিযোগ করেছে, চীনের চাপের কারণে ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ডকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।
তাইওয়ানের যুক্তি হলো—কোনো রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য, মহামারি প্রস্তুতি বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে বাদ পড়া উচিত নয়।
অন্যদিকে বেইজিং তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে দেখে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় তাইওয়ানের আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে। ফলে বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অংশগ্রহণের প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
তাইওয়ানের ওপর চাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো আলাদা আলাদা নয়।
সামরিক চাপ মানুষকে নিরাপত্তাহীন করে। অর্থনৈতিক চাপ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। তথ্যযুদ্ধ রাজনৈতিক বিভাজনকে তীব্র করতে পারে। আর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা দেশটির জন্য কূটনৈতিক বিকল্প কমিয়ে দেয়।
এই চারটি চাপ একসঙ্গে কাজ করলে একটি গণতন্ত্রের ভেতরে একটি বিপজ্জনক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কি আমাদের নিরাপদ রাখতে পারছে?’
এই প্রশ্নের উত্তর যদি জনগণের একটি বড় অংশের কাছে নেতিবাচক হয়ে যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল হতে পারে।
তবে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্রও দেখা যাচ্ছে। সামরিক চাপের জবাবে দেশটি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, বেসামরিক প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত করছে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে। ২০২৬ সালের হান কুয়াং সামরিক মহড়াতেও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে, সে ধরনের পরিস্থিতির অনুশীলন করা হয়েছে।
অর্থাৎ চাপ যত বাড়ছে, তাইওয়ানও তার গণতান্ত্রিক ও সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তাইওয়ানের প্রশ্নকে শুধু চীন ও তাইওয়ানের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা ভুল হবে।
তাইওয়ান এমন একটি উদাহরণ, যেখানে একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে সামরিক যুদ্ধ ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে। এই চাপের পদ্ধতিগুলো ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্য দেশেও দেখা যেতে পারে—বিশেষ করে যেখানে একটি ছোট বা মাঝারি আকারের গণতন্ত্র একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মুখোমুখি।
তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু তাইওয়ান টিকে থাকবে কি না—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, একটি গণতন্ত্র তার নাগরিকদের স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অধিকার কতটা ধরে রাখতে পারে, যখন তার চারপাশে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, তথ্যযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক চাপ একসঙ্গে কাজ করে।
তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই সব সময় ভোটের দিনেই হয় না। কখনো তা হয় তথ্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্যের লড়াইয়ে, কখনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে, কখনো আন্তর্জাতিক সংস্থার দরজায় এবং কখনো যুদ্ধবিমানের শব্দের মধ্যেও।
২০২৬ সালে তাইওয়ানের সামনে সেই পরীক্ষাই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বেইজিংয়ের চাপ যেমন বাস্তব, তেমনি তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনও বাস্তব। ফলে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য শুধু বাইরের সমর্থন নয়, নিজেদের প্রতিষ্ঠান, তথ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও শক্তিশালী করতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করার জন্য সব সময় ট্যাংক নামাতে হয় না। কখনো কখনো মানুষের ভয়, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তাই যথেষ্ট।