চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের স্থপতি ঝু রংজি আর নেই

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি আর নেই। ৯৭ বছর বয়সে বেইজিংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই কিংবদন্তি নেতা। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ঝু রংজি ‘চীনের অর্থনৈতিক জার’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে বাজারমুখী ও উন্মুক্ত অর্থনীতিতে চীনের রূপান্তরের স্থপতি হিসেবে তিনি যে সাহসী সংস্কারগুলো এনেছিলেন, তা-ই চীনকে আজকের এই অপ্রতিরোধ্য বিশ্বশক্তিতে পরিণত করেছে।

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী ঝু রংজি দেশটির মর্যাদাপূর্ণ সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। মাও সেতুং-এর শাসনামলের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তার প্রাথমিক কর্মজীবন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করার দায়ে তাকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তিনি আবারও নিপীড়নের শিকার হন।

মাও-এর মৃত্যুর পর রাজনৈতিকভাবে পুনর্বহাল হওয়ার সুযোগ পান তিনি। ১৯৮৮ সালে সাংহাইয়ের মেয়র হিসেবে তার দক্ষ ও সাহসী কাজ ডেং শিয়াওপিং-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা তাকে চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বের মূল ধারায় নিয়ে আসে। ১৯৯১ সালে ভাইস প্রিমিয়ার এবং সাত বছর পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি চীনের অর্থনীতির হাল ধরেন।

ঝু রংজির নেতৃত্বই ছিল চীনের অর্থনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক অধ্যায়। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে তিনি একের পর এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করেন। তিনি চীনের উচ্চমুখী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেন, কর ও রাজস্ব ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন করেন এবং ১৯৯৭ সালের এশিয়ান আর্থিক সংকটের মধ্যেও চীনের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখেন।

তবে তার সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত পদক্ষেপ ছিল অদক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগগুলোর (এসওই) সংস্কার, যার ফলে আনুমানিক ৪ কোটি শ্রমিক চাকরিচ্যুত হন। সেই সময়ে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা হয়েছিল এবং অনেকে তাকে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার অভিযোগও এনেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, এই কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া চীনের অর্থনৈতিক মুক্তি ও আধুনিকায়ন সম্ভব ছিল না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঝু রংজি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় থাকবেন ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে। ডব্লিউটিও-তে যোগদান ছিল চীনকে বিশ্ব অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার এক যুগান্তকারী মুহূর্ত, যা পরবর্তী দশকগুলোতে চীনের দ্বি-অংকের প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্ফোরণের পথ প্রশস্ত করে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার আপসহীন মনোভাব, কঠোর বাস্তববাদ এবং সাহসী কথা বলার জন্য তিনি ‘লৌহদণ্ড প্রধানমন্ত্রী’ নামে পরিচিতি পান। সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি একবার বলেছিলেন, “তাদের সত্য কথা বলার সাহস থাকতে হবে, কারও মনে আঘাত লাগার ভয় পেলে চলবে না।”

যে দেশে নেতাদের কথার ছক বাঁধা ও নীরস ভাষণের প্রচলন ছিল সেখানে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, রসবোধ এবং কখনও কখনও উষ্ণমেজাজ তাকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে । ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমার সামনে যদি খনি বা গভীর খাদও থাকে, তবুও আমি বিনা দ্বিধায় এগিয়ে যাব এবং মৃত্যু পর্যন্ত আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”

ঝু রংজির প্রয়াণ কেবল একজন নেতার বিদায় নয়, বরং অনেক চীনা নাগরিকের কাছে তা তাদের দেশের সংস্কারবাদী বছরগুলোর সেই অর্থনৈতিক আশাবাদের যুগেরও ইতি টানলো। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি যখন কয়েক দশকের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির পর কিছুটা থমকে দাঁড়িয়েছে, তখন ঝু রংজির মতো নেতাদের উত্তরাধিকার আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

প্রয়াত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঝু রংজির রচনা ও ভাষণের সংকলনের ভূমিকায় তাকে “একটি প্রখর মস্তিষ্ক” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, যিনি “আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচির সাথে লড়াই করেছিলেন।”

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, তিনি তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে গেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির শোকবার্তায় তার জনগণের প্রতি “গভীর স্নেহ” এবং একজন জনসেবক হিসেবে তার অবদানের কথা স্মরণ করা হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র পাল্টে দেওয়া এই স্থপতির বিদায়ের মধ্য দিয়ে চীনের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের ইতি ঘটলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *