ভিডিও কলের ওপারে নীরবতা: মহানগরে একা থাকা প্রজন্মের আত্মহত্যা

বসুন্ধরার একটা ফ্ল্যাট। একটা ফোন। একটা ভিডিও কল। আর একটা তরুণী, যিনি চিরতরে ঘুমিয়ে পড়লেন। এটা কি শুধু রিধিকার গল্প? নাকি পুরো এক প্রজন্মের নীরব চিৎকার?

রাত সাড়ে এগারোটা। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটা ফ্ল্যাট।

ফ্ল্যাটের ভেতরে একাই থাকেন রিধিকা রিধি। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। পেশায় মডেল ও অভিনেত্রী। পরিবার মাদারীপুরে। ঢাকায় তিনি একা।

সেই রাতে তিনি ভিডিও কলে ছিলেন। কার সাথে? বন্ধু, নাকি বয়ফ্রেন্ড? তদন্ত চলছে, তাই সেটা নিয়ে বেশি বলছি না।

কিন্তু আমরা যা জানি—কথা কাটাকাটি হয়েছে। কথায় কথায় এমন একটা পর্যায়ে গেছে, যেখানে রিধিকা মনে করেছেন, সব শেষ।

তারপর তিনি চরম একটা সিদ্ধান্ত নেন।

বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

রিধিকার ঘটনাটা দুঃখজনক। কিন্তু এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত দুই বছরে বাংলাদেশে একই প্যাটার্নে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে।

বরিশালে ২২ বছর বয়সী কলেজ ছাত্র রাইয়ান একা ভাড়া বাসায় থাকতেন, ব্রেকআপের পর আত্মহত্যা। রাজশাহীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহফুজ হলের রুমে একা। প্রেমিকার সাথে ঝগড়া করে আত্মহত্যা। কুমিল্লা হোমনার গৃহবধু সালমা। স্বামীর সাথে অনলাইনে ঝগড়া করে আত্মহত্যা। কক্সবাজারের তরুণ ফ্রিল্যান্সার সৌরভ। । একা ফ্ল্যাটে থাকতেন। আত্মহত্যা। টাঙ্গাইলের কলেজ ছাত্র রাসেল।  প্রেমিকার সাথে কথা কাটাকাটি করে আত্মহত্যা। কুমিল্লার তরুণী লালমাইয়ের জান্নাতুল ফেরদৌস। । একা থাকতেন। আত্মহত্যা।

আর সর্বশেষ—রিধিকা রিধি।

এই তালিকাটা আরও লম্বা হতে পারত। কিন্তু আমরা শুধু সেই ঘটনাগুলোই জানি, যেগুলো মিডিয়ায় এসেছে।

এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন আছে।

প্রথমত: এরা সবাই তরুণ। বয়স ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে। দ্বিতীয়ত:  এদের অনেকেই একা থাকেন। ঢাকায়, অথবা অন্য মহানগরে। পরিবার থেকে দূরে। তৃতীয়ত: এদের প্রায় সবার ক্ষেত্রেই একজন মানুষকে ঘিরে তৈরি আবেগের একটা দুনিয়া ছিল। প্রেমিক, প্রেমিকা, অথবা খুব কাছের কোনো বন্ধু। চতুর্থত: ঝগড়া বা ব্রেকআপের পর এরা ভিডিও কলে, অথবা অনলাইনে চ্যাটে ছিলেন। এবং পঞ্চমত: এরা সবাই চরম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে—আত্মহত্যা করেছেন।

কিন্তু কেন?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মহানগরে একা থাকা তরুণদের একটা বড় সমস্যা হলো—তাদের পুরো জগৎটা একজন মানুষকে ঘিরে তৈরি হয়ে যায়। “যখন কোনো তরুণ পরিবার থেকে দূরে একা থাকেন, তখন তার ইমোশনাল সাপোর্ট সিস্টেমটা খুবই সীমিত হয়ে যায়। অনেক সময় সেটা একজন প্রেমিক বা প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে সেই মানুষটার সাথে ঝগড়া বা ব্রেকআপ মানেই তার কাছে পুরো জগৎ শেষ হয়ে যাওয়া।”

“এই তরুণদের কাছে বিকল্প কোনো সাপোর্ট সিস্টেম থাকে না। পরিবার দূরে। বন্ধুরা ব্যস্ত। ফলে একজন মানুষই হয়ে ওঠে তার পুরো জগৎ। আর সেই জগৎ ভেঙে গেলে সে আর কিছু দেখতে পায় না।”

রিধিকার ঘটনায় একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—তিনি ভিডিও কলে ছিলেন।

এটা কি কাকতালীয়?

নাকি এর পেছনে একটা অবচেতন তাড়না কাজ করেছে?

অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক সময় আত্মহত্যার আগে মানুষ একটা “মেসেজ” পাঠাতে চায়। “যখন কোনো মানুষ ভিডিও কলে বা চ্যাটে থাকার সময় আত্মহত্যা করে, তখন এর পেছনে প্রায়ই একটা ‘অপরাধবোধ তৈরি করার’ তাড়না কাজ করে। সে চায়, অপর প্রান্তের মানুষটা দেখুক। সে চায়, সেই মানুষটা বুঝুক—’তুমিই এর জন্য দায়ী’।”

“এটা একধরনের পোস্ট-মর্টেম রিভেঞ্জ। মৃত্যুর পরেও সে চায়, বেঁচে থাকা মানুষটা আজীবন এই অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচুক।”

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রজন্মের আরেকটা বড় সমস্যা হলো—তারা বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জীবনের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

“আজকের তরুণরা ফিজিক্যালি একা থাকলেও ভার্চুয়ালি সবসময় কানেক্টেড। তাদের ফোনে হাজার হাজার ফ্রেন্ড, সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার ফলোয়ার। কিন্তু বাস্তবে যখন কোনো সংকট আসে, তখন তারা দেখেন—পাশে বসে দুটো কথা বলার মতো কেউ নেই।”

তার ভাষ্য, “এই যে কানেক্টিভিটি আর আইসোলেশনের প্যারাডক্স, এটাই আজকের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তারা সবসময় অনলাইনে, কিন্তু বাস্তবে একদম একা।”

এই সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশের নয়। সারা বিশ্বেই তরুণদের আত্মহত্যার হার বাড়ছে।

জাপানে ‘কোডোকু শি’ বা ‘সলিটারি ডেথ’ একটা বড় সমস্যা। হাজার হাজার মানুষ একা একা ফ্ল্যাটে মারা যান, কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পরে তাদের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণদের আত্মহত্যার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সরকার ‘সুইসাইড প্রিভেনশন ডে’ ঘোষণা করেছে, কিন্তু সমস্যা কমেনি।

আমেরিকায় ২০২০-২০২৫ সালের মধ্যে তরুণদের আত্মহত্যার হার অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে।

ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১.৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে বড় একটা অংশ তরুণ, যারা একা থাকেন, অথবা প্রেম সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগেন।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। কিন্তু পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে বড় একটা অংশ তরুণ। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের মতো মহানগরে একা থাকা তরুণদের আত্মহত্যার হার বেশি।

এই সমস্যার সমাধান কী?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রথমেই দরকার ‘ইমোশনাল রেজিলিয়েন্স’ বা আবেগীয় সহনশীলতা তৈরি করা। “তরুণদের শেখাতে হবে—একজন মানুষের সাথে ব্রেকআপ মানে পুরো জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। জীবনে আরও অনেক মানুষ আছে, অনেক সুযোগ আছে।”

তার ভাষ্য, “দ্বিতীয়ত, দরকার ‘অফলাইন সাপোর্ট সিস্টেম’ তৈরি করা। তরুণদের শেখাতে হবে—ফোনের বাইরেও জীবন আছে। বাস্তবে বন্ধু তৈরি করতে হবে, পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।”

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দরকার ‘কমিউনিটি বিল্ডিং’। “মহানগরে একা থাকা তরুণদের জন্য দরকার কমিউনিটি স্পেস। যেখানে তারা একে অপরের সাথে মিলতে পারবে, কথা বলতে পারবে। শুধু ভার্চুয়ালি নয়, ফিজিক্যালি।”

ফিরে আসি রিধিকার কাছে।

বসুন্ধরার সেই ফ্ল্যাটটা এখন খালি।

পরিবার মাদারীপুর থেকে এসেছিলেন। তারা রিধিকার মৃতদেহ নিয়ে ফিরে গেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—

কতজন রিধিকা এই মুহূর্তে ঢাকার কোনো ফ্ল্যাটে একা বসে আছেন?

কতজন রিধিকা এই মুহূর্তে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন, অপেক্ষা করছেন কোনো মেসেজের?

কতজন রিধিকা এই মুহূর্তে মনে মনে ভাবছেন—সব শেষ?

আমরা জানি না।

কারণ তারা নীরব।

আমরাও নীরব।

সত্যি কথা বলতে কি, একটা নীরব-নির্ঘুম প্রজন্ম তৈরি হয়েছে।

তারা মহানগরে একা থাকেন। তারা ভার্চুয়ালি কানেক্টেড, কিন্তু বাস্তবে আইসোলেটেড। তারা একজন মানুষকে ঘিরে পুরো একটা জগৎ তৈরি করেন, আর সেই জগৎ ভেঙে গেলে তারা আর কিছু দেখতে পান না।

রিধিকার ঘটনাটা শুধু রিধিকার গল্প নয়। এটা পুরো এক প্রজন্মের গল্প।

আর এই প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে আমাদের বুঝতে হবে—ভিডিও কলের ওপারে একটা মানুষ আছেন, যিনি হয়তো এই মুহূর্তে চরম একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবছেন।

আমরা কি সেই মানুষটাকে থামাতে পারব?

নাকি আরও একটা রিধিকাকে হারাব?

উত্তরটা আমাদের হাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *