রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জরুরি প্রস্তুতি জোরদারে গুরুত্ব

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও জরুরি সাড়াদানব্যবস্থা নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে তা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং কার্যকর আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আসন্ন জরুরি প্রস্তুতি পর্যালোচনা মিশন সামনে রেখে শনিবার (১৭ই অক্টোবর) ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) মিলনায়তনে আয়োজিত এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। আগামী ৮ থেকে ১৮ নভেম্বর ২০২৬ এই মিশন বাংলাদেশ সফর করবে।

কর্মশালার শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশে আইএইএর জরুরি প্রস্তুতি পর্যালোচনা মিশন উপলক্ষে অংশীজনদের প্রস্তুতিমূলক কর্মশালা’। এতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা দল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব বলেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। তবে শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতির আশঙ্কা কম হলেও এর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি বজায় রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

সচিবের মতে, জরুরি অবস্থা কখন ঘোষণা করা হবে, কীভাবে জাতীয় পর্যায়ে তথ্য ও নির্দেশনা পৌঁছানো হবে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে উদ্ধার ও সাড়াদান কার্যক্রমের সমন্বয় কীভাবে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট লিখিত নির্দেশনা থাকা জরুরি।

জরুরি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, চিকিৎসা দল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। চিকিৎসাসেবা, রোগী পরিবহন, প্রয়োজনীয় বিচ্ছিন্নকরণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টনের জন্যও কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার আসন্ন পর্যালোচনা মিশনকে কোনো পরীক্ষা হিসেবে না দেখে দেশের বিদ্যমান প্রস্তুতি যাচাই, দুর্বলতা শনাক্ত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা থেকে শেখার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

সচিব বলেন, এর আগে সম্পন্ন করা স্ব-মূল্যায়নের ফলাফল মিশনের প্রস্তুতিতে দিকনির্দেশনা দেবে বলে তিনি আশা করেন। মিশনের সুপারিশ কাজে লাগিয়ে দেশের জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়াদানব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের পরিবেশ ও বিকিরণমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব। তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এসব তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম শুরুর আগের পরিবেশগত ও বিকিরণ পরিস্থিতির ভিত্তিমাত্রার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের তথ্য তুলনা করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে সচিব বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিকিরণ নিয়ে জনসাধারণকে সঠিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য জানানো প্রয়োজন। তথ্যের ঘাটতি বা ভুল ব্যাখ্যা থেকে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহজবোধ্য ভাষায় তথ্য প্রকাশ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গড়ে তোলা জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়াদানব্যবস্থা ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্যও কার্যকর মডেল হতে পারে।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের প্রথম সাড়াদানকারী থেকে জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যন্ত প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, কর্মশালার মূল লক্ষ্য হলো আসন্ন পর্যালোচনা মিশন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অভিন্ন ধারণা তৈরি, স্ব-মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রস্তুতির ঘাটতি শনাক্ত এবং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও করণীয় নির্দিষ্ট করা।

চেয়ারম্যান আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ, মতামত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার পারমাণবিক জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়াদানব্যবস্থার সক্ষমতা তুলে ধরতে পারবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পারমাণবিক শক্তি) আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী। কর্মশালায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

কর্মশালায় আইএইএর আসন্ন জরুরি প্রস্তুতি পর্যালোচনা মিশন উপলক্ষে একটি পুস্তিকার মোড়কও উন্মোচন করা হয়।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *