তালাআল বদরু আলাইনা মিন সানিয়াতিল ওদা’
ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা মা দাআ লিল্লাহি দা’
আইয়ুহাল মাবউসু ফীনা জি’তা বিল আমরিল মুতা’
জি’তা শাররাফতাল মাদীনাহ মারহাবান ইয়া খায়রা দা’
মিলাদুন্নবীকে ঘিরে এবারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৃশ্য কিছুটা ভিন্ন। শহুরে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের মানুষ—অনেকেই প্রকাশ্যে নবীপ্রেম, দরুদ ও ইসলামি গান-গজল নিয়ে পোস্ট করছেন। একসময় যে ধর্মীয় আবেগ প্রকাশ করতে অনেকে সামাজিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা করতেন, সেই সংকোচ যেন কিছুটা কমেছে।
প্রশ্ন হলো, এটি কি বাংলাদেশের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে কোনো গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা দিয়ে পুরো সমাজের পরিবর্তন মাপা যায় না। তবু সাম্প্রতিক দৃশ্যটি উপেক্ষা করার মতো নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ, তরুণ প্রজন্ম এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকে প্রকাশ্যে নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করছেন।
এর একটি সামাজিক তাৎপর্য আছে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে ধর্মীয় অনুশীলন বা ইসলামি পরিচয় প্রকাশকে কখনো কখনো ‘রক্ষণশীলতা’ কিংবা ‘সাম্প্রদায়িকতা’র সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
ফলে অনেক মানুষ নিজের ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও এক ধরনের আত্মসংযম অবলম্বন করেছেন।
কিন্তু সেই সামাজিক সংকোচ এখন আগের মতো শক্তিশালী নেই—এমন একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত অন্তত দেখা যাচ্ছে।
কোনো মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেই তিনি অসহিষ্ণু—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করলেই কেউ উদার বা মানবিক হয়ে যান—এটিও সত্য নয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানদণ্ড হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়।
একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ, উদার, মানবিক এবং বহুত্ববাদী হতে পারেন। আবার ধর্মের পরিচয় ব্যবহার করেও কেউ অসহিষ্ণু হতে পারেন। অর্থাৎ মানুষের নৈতিক চরিত্রকে শুধু তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে বিচার করা যায় না।
এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের সামাজিক পরিসরে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যায়: ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের অধিকারকে হয়তো ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে, ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখা হচ্ছে।
মিলাদুন্নবী বা মাওলিদ পালন নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ফিকহি মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম মনে করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম বা ইসলামের প্রাথমিক যুগে তাঁর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে বার্ষিক উৎসব পালনের নির্দিষ্ট নজির নেই। তাঁদের দৃষ্টিতে দ্বীনের অংশ হিসেবে পরবর্তীকালে এমন একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক আয়োজন যুক্ত করা বিদআতের প্রশ্ন তৈরি করে।
অন্যদিকে বহু আলেম মনে করেন, নবীজির (সা.) জন্ম ও জীবন স্মরণ করে কোরআন তিলাওয়াত, সীরাত আলোচনা, দরুদ, দান-সদকা ও বৈধ নেক আমলের সমাবেশ—যদি শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়—তাহলে সেটিকে বৈধতার আলোকে দেখা যেতে পারে।
মিলাদ আয়োজনের ইতিহাস নিয়েও বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। মধ্যযুগে ইরাকের এরবেলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বড় আকারের মাওলিদ আয়োজনের ঐতিহাসিক নজির পাওয়া যায়। তবে এটিকে একক কোনো ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট সাল থেকে শুরু হয়েছে বলে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা ইতিহাসের জটিলতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।
এটি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী ফিকহি বিতর্ক—যার দুই পক্ষেরই নিজস্ব দলিল ও ব্যাখ্যার ঐতিহ্য রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবারে রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, “এই দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।” (সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ, তিনি নিজেই তাঁর জন্মের নেয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে ইবাদত (রোজা) করেছেন।
এই হাদিসকে মিলাদ পালনের সরাসরি দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হবে কি না, সেটি নিয়েও আলেমদের মধ্যে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য রয়েছে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, তাঁর জন্মের সঙ্গে সোমবারের ইবাদতের একটি সম্পর্ক রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই উল্লেখ করেছেন।
একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে এই দীর্ঘ বিতর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে: আমি কী করব?
মিলাদুন্নবী পালন করা উচিত কি উচিত নয়—এ নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক করতে পারি। কিন্তু এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর মৌলিক গুরুত্ব নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিতর্ক নেই।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ—এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই।। আমরা কি সময়মতো সালাত আদায় করি?
সত্যবাদিতা ও আমানত রক্ষা ইসলামের মৌলিক নৈতিক শিক্ষা—এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। ব্যবসা, চাকরি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে আমরা কি সত্যিই তার প্রতিফলন ঘটাই?
গীবত, অন্যের অধিকার নষ্ট করা এবং মানুষের প্রতি জুলুম নিন্দনীয়—এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই । পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা অধীনস্থ মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণ কেমন?
এই প্রশ্নগুলো হয়তো কোনো ফেসবুক বিতর্কে খুব বেশি উত্তেজনা তৈরি করে না। কিন্তু একজন মুসলমানের চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি।
এখানে একটি গভীর শিক্ষা আছে।
ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; ভালোবাসার একটি নৈতিক পরিণতিও আছে। কাউকে ভালোবাসলে তার প্রভাব আমাদের আচরণে পড়ার কথা।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা তাই শুধু ১২ই রবিউল আউয়ালের একটি পোস্ট, একটি গজল, একটি মিছিল কিংবা মিষ্টি বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়।
আসল পরীক্ষা হয় অন্য জায়গায়।
আমরা কি তাঁর সত্যবাদিতা অনুসরণ করি?
আমরা কি তাঁর ক্ষমাশীলতা অনুসরণ করি?
আমরা কি দুর্বল মানুষের প্রতি সদয় হতে পারি?
আমরা কি প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করি?
আমরা কি রাগের মুহূর্তে সংযত হতে পারি?
আমরা কি ক্ষমতা ও সুবিধা পাওয়ার পরও ন্যায়বিচার করতে পারি?
নবীপ্রেমের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত সেখানেই।
মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মতভেদ থাকবে। কেউ এটিকে বৈধ মনে করবেন, কেউ করবেন না। ইসলামের দীর্ঘ ফিকহি ঐতিহ্যে এমন মতভেদ নতুন কোনো ঘটনা নয়।
যারা মিলাদ পালন করেন, তাঁদের উচিত ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে এমন কিছু না মেশানো, যা শরিয়তসম্মত নয় কিংবা আকিদাগত সীমা অতিক্রম করে।
আবার যারা মিলাদ পালন করেন না, তাঁদেরও উচিত নয় অন্য মুসলিমের অন্তরের নবীপ্রেমের বিচারক হয়ে ওঠা।
ফিকহি মতভেদকে ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা ঈমানের সার্টিফিকেট বিতরণের অস্ত্রে পরিণত করা হলে আমরা হয়তো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাম নিয়েই এমন আচরণ করব, যা তাঁর শেখানো আদবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
১২ই রবিউল আউয়াল এলে শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখের দিকে তাকানোর বদলে নিজের জীবনটার দিকেও একবার তাকানো যেতে পারে।
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোন সুন্নাহটা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে?”
হয়তো সেটা সময়মতো সালাত। হয়তো সকাল-সন্ধ্যার যিকির। হয়তো পরিবারের সাথে কোমল ব্যবহার। অথবা কারও প্রতি জমে থাকা রাগ ক্ষমা করে দেওয়া। এর মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিন। এবং সেটাকে শুধু আজকের জন্য নয়, সারাজীবনের জন্য নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করুন।।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা কোনো একটি দিনের জন্য আসেনি। তা আমাদের প্রতিটি সকাল, প্রতিটি রাত, প্রতিটি সম্পর্ক এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য।
মিলাদুন্নবী পালন করা হবে কি হবে না—এই বিতর্কের উত্তর আলেমরা তাঁদের নিজ নিজ জ্ঞান ও ফিকহি পদ্ধতিতে দেবেন।
কিন্তু আমাদের সবার জন্য আরও একটি প্রশ্ন খোলা থাকুক:
আমরা যদি সত্যিই তাঁকে ভালোবাসি, তাহলে তাঁর চরিত্রের কোন অংশটি আজ থেকে আমাদের নিজেদের জীবনে ফিরিয়ে আনব?