ঢাকার ক্রমবর্ধমান নিরাপদ পানির চাহিদা মেটাতে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে বড় ধরনের অর্থায়ন করছে ডেনমার্ক। এ প্রকল্পে দেশটি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অনুদান এবং বাকি ৩ হাজার কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। ঋণটি ২০ বছরে পরিশোধ করবে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (২৫শে আগস্ট) রাজধানীর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার। বৈঠকে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের পর প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে ডেনমার্কের সহায়তা একটি বড় অগ্রগতি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মেঘনা নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে প্রতিদিন ৯৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
ডেনমার্কের দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, পুরো সম্প্রসারণ প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব আরও বিস্তৃত। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আনুমানিক ৭ থেকে ৯ কোটি মানুষ নয়, বরং ৭ থেকে ৯ মিলিয়ন বা ৭০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধা পেতে পারেন। এ বিনিয়োগ ঢাকার জনস্বাস্থ্য এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে।
ডেনমার্কের পরিকল্পিত অর্থায়ন প্যাকেজের পরিমাণ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ইউরো অনুদান হিসেবে দেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটি। ডেনমার্কের ইমপ্যাক্ট ফান্ড-এর মাধ্যমে এই অর্থায়ন করা হবে বলে দূতাবাস জানিয়েছে।
সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ অবশ্য একক কোনো অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি ইউরোপীয় ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়ন রয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় মেঘনা নদী থেকে কাঁচা পানি সংগ্রহ, পানি পরিবহন এবং পরিশোধিত পানি বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ঢাকার পানির উৎসে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো। মেঘনা নদী থেকে পানি এনে পরিশোধনের মাধ্যমে রাজধানীর জন্য আরও টেকসই পানির উৎস তৈরি করা হবে। এ ধরনের উদ্যোগ ঢাকার ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক হতে পারে। সায়েদাবাদ প্রকল্পের কাঁচা পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় মেঘনা নদীকে প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈঠকে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের নতুন স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ডেনমার্কের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কার উদ্যোগের প্রতিও সমর্থন জানানো হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই চার্টারের বিষয়টিও রয়েছে বলে দূতাবাসের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশের পানি খাতে ডেনমার্কের সহযোগিতা সায়েদাবাদ প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। উপকূলীয় এলাকায় সৌরবিদ্যুৎচালিত পানি সরবরাহ কেন্দ্র, জলবায়ু সহনশীল ওয়াশ সেবা এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগেও দেশটির সহযোগিতা রয়েছে।
মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেছেন, ঢাকার নিরাপদ পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও পানি সংকট মোকাবিলায় ডেনমার্ক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। পানি সরবরাহের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রকল্পেও দেশটির বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সায়েদাবাদ প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ বাস্তবায়িত হলে ঢাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে মেঘনা নদীর পানি পরিশোধন ও বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক উন্নয়ন অংশীদারিত্বের একটি বড় অবকাঠামোগত উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।