কুষ্টিয়ায় নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস: সাবেক আরএমও হোসেন ইমামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা

কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তৎকালীন আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হোসেন ইমামের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

মামলাটি হয়েছে ১০/২০২৬ নম্বরে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তাকে অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের শৃঙ্খলা-১ শাখার সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ১১-২০ গ্রেডের শূন্য পদে জনবল নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে অন্যায়ভাবে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পাওয়া গেছে।

এ কারণে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিষয়টি অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত দণ্ড দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের ২৪শে অক্টোবর। ওই দিন ডা. হোসেন ইমামের বাসা থেকে কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে বের হতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে।

এরপর অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে যে, অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়েছিল। প্রশ্নফাঁসের পর তার বাসায় কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।

ঘটনাটি নিয়ে কুষ্টিয়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন মহল থেকে বিষয়টি তদন্তের দাবি ওঠে।

প্রাথমিকভাবে নিয়োগ পরীক্ষার সঙ্গে আরএমও হোসেন ইমামের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। এরপরও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক।

পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে কমিটি ডা. হোসেন ইমামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায়। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে বিভাগীয় মামলা দায়ের হওয়া বা তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার অর্থ চূড়ান্তভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। কারণ দর্শানোর জবাব এবং পরবর্তী বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয় সাতটি পদে মোট ১১৫ জন নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল।

এর মধ্যে স্বাস্থ্য সহকারী পদে ৯৭ জন, পরিসংখ্যানবিদ পদে তিনজন, কোল্ড চেইন টেকনিশিয়ান পদে একজন, স্টোর কিপার পদে চারজন, সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে একজন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে পাঁচজন এবং ড্রাইভার পদে চারজন নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল।

নিয়োগের জন্য অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয় ২০২৫ সালের ৪ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত।

এই নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরেই প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। পরে অভিযোগ তদন্তে নামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিটি।

এই ঘটনায় ডা. হোসেন ইমাম ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. এসএম কামাল হোসেন বলেন, এ ধরনের তথ্য তার জানা নেই। বিষয়টি তদন্ত কমিটি বলতে পারবে।

অন্যদিকে, ডা. হোসেন ইমামের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলার পর এখন তার দেওয়া কারণ দর্শানোর জবাব এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে নজর রয়েছে।

নিয়োগ পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রক্রিয়ায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এই ঘটনা কুষ্টিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

 

 

ফরিদ আহমেদ
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *