খায়রুল ভাই: মানুষে মানুষে সেতু গড়া এক সংযোগবিন্দু

খায়রুল ভাইয়ের স্মৃতিচারণ: মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও সংযোগ তৈরিতে তাঁর ভূমিকার প্রতীকী ছবি।

ডাঃ জহিরুল ইসলাম

খায়রুল ভাইয়ের কথা ভাবতে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়, মানুষ আসলে একা মানুষ নয়। একজন মানুষের সঙ্গে আরও অনেক মানুষ লেগে থাকে—কেউ কাছে, কেউ দূরে; কেউ বহুদিনের বন্ধু, কেউ সামান্য পরিচিত। এই সম্পর্কের জালটাই শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের সামাজিক জীবন। খায়রুল ভাই এই জালের মধ্যে কেবল একটি বিন্দু ছিলেন না; অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন বিন্দুকে জুড়ে দেওয়ার জায়গা ছিলেন।

তাঁর মানুষ চেনার পরিধি বড় ছিল। কিন্তু মানুষ চেনা আর মানুষকে মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া এক কথা নয়। আমাদের সমাজে প্রথম ধরনের লোক অনেক আছেন, দ্বিতীয় ধরনের লোক কম। খায়রুল ভাই একজনের মধ্যে আরেকজনের সম্ভাবনা দেখতে পেতেন। কোথাও একজন তরুণ ভালো কাজ করছেন, কোথাও একজন অভিজ্ঞ মানুষের সাহায্য দরকার, কোথাও দুজন মানুষ পরস্পরকে জানলে নতুন কিছু ঘটতে পারে—খায়রুল ভাই মাঝখানে একটা রাস্তা খুলে দিতেন। তারপর অনেক সময় নিজেই সরে যেতেন।

সমাজবিজ্ঞানে এর একটা সুন্দর ব্যাখ্যা আছে। আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে যে ছোট বৃত্ত, তার বাইরে অসংখ্য আলগা পরিচয় থাকে। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক নতুন খবর, নতুন সুযোগ, নতুন মানুষ আমাদের কাছে আসে এই দূরের সম্পর্কগুলো দিয়েই। মার্ক গ্রানোভেটার একে বলেছেন ‘Strength of Weak Ties’ বা দুর্বল সম্পর্কের শক্তি। খায়রুল ভাইয়ের শক্তি ছিল এই দুর্বল বন্ধনগুলোকে সচল রাখা। তাঁর কাছে পরিচিতির অর্থ শুধু নাম-ফোন নম্বর জমিয়ে রাখা ছিল না; পরিচিতির অর্থ ছিল একজন মানুষের দিকে আরেকজন মানুষের দরজা খুলে দেওয়া।

আরেকটি ব্যাপারও ছিল। সমাজে অনেকগুলো আলাদা দ্বীপ থাকে—প্রতিষ্ঠানের দ্বীপ, পেশার দ্বীপ, প্রজন্মের দ্বীপ, বন্ধুত্বের দ্বীপ, কখনো মতেরও দ্বীপ। এদের মাঝখানে ফাঁকা জায়গা পড়ে থাকে। খায়রুল ভাই সেই ফাঁকা জায়গাগুলোতে সেতু বসাতেন। ফলে যাঁদের দেখা হওয়ার কথা ছিল না, তাঁদের দেখা হতো; যাঁদের একসঙ্গে কাজ করার কথা কেউ ভাবেননি, তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হতো। এই সেতু তৈরির ক্ষমতাই ছিল তাঁর সামাজিক পুঁজি। কিন্তু তাঁর বিশেষত্ব ছিল—এই পুঁজি তিনি শুধু নিজের জন্য জমাতেন না, অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন।

এইখানে খায়রুল ভাইকে নিছক ‘নেটওয়ার্কার’ বললে ভুল হবে। নেটওয়ার্কার নিজের চারদিকে নেটওয়ার্ক তৈরি করেন; ‘কানেক্টর’ অন্যদের মধ্যেও নেটওয়ার্ক তৈরি করে দেন। প্রথমজনের অনুপস্থিতিতে তাঁর নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়তে পারে। দ্বিতীয়জন সফল হলে তাঁর অনুপস্থিতিতেও মানুষে মানুষে তৈরি সম্পর্ক বেঁচে থাকে। খায়রুল ভাই সম্ভবত দ্বিতীয় ধরনের মানুষ ছিলেন।

তাঁর সম্পর্কের জগতটাও কোনো পিরামিডের মতো ছিল না। কে বড়, কে ছোট, কে গুরুত্বপূর্ণ, কে কম গুরুত্বপূর্ণ—এই হিসাব দিয়ে সব সম্পর্ক তৈরি হতো না। বরং গাছের শিকড়ের মতো এক সম্পর্ক থেকে আরেক সম্পর্ক বেরিয়েছে, সেখান থেকে আরও কয়েকটি। কোথায় শুরু, কোথায় শেষ—বোঝা কঠিন। একজন মানুষ আরেকজনকে চিনেছেন, তিনি তৃতীয়জনকে; কোনো এক জায়গায় গিয়ে দেখা গেছে, এই বিস্তৃত সম্পর্কের গোড়ায় কোথাও খায়রুল ভাইয়ের একটি পরিচয় করিয়ে দেওয়া, একটি ফোন, একটি আড্ডা কিংবা একটি ছোট বাক্য কাজ করেছে।

তাই খায়রুল ভাইয়ের চলে যাওয়াকে শুধু একজন প্রিয় মানুষের মৃত্যু হিসেবে দেখলে ক্ষতির পুরোটা ধরা পড়ে না। একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দু সরে গেলে সম্পর্কের মানচিত্রও খানিকটা বদলে যায়। যে চৌরাস্তায় এসে অনেক রাস্তা মিলত, সেই চৌরাস্তাটি হঠাৎ নেই হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *