ভারত-শাসিত কাশ্মীরে মসজিদ ও মাজারে শুক্রবারের জুমার খুতবার জন্য অভিন্ন বিষয় নির্ধারণের উদ্যোগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ডের এ উদ্যোগকে ধর্মীয় বিষয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিরা। অন্যদিকে, বোর্ডের বক্তব্য, ধর্মীয় পণ্ডিতদের সমন্বয় এবং সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনাকে উৎসাহিত করাই উদ্যোগটির উদ্দেশ্য।
টিআরটি ওয়ার্ল্ডে প্রকাশিত একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে বিষয়টিকে কাশ্মীরের মুসলমানদের ধর্মীয় অভিব্যক্তি ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিবন্ধটির লেখক আহমেদ বিন কাসিমের মতে, খুতবার বিষয় নির্ধারণের প্রস্তাবকে কেবল প্রশাসনিক সমন্বয়ের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ইতিহাস আড়ালে থেকে যায়।
২০২৬ সালের অক্টোবরে জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ড বোর্ডের অধীন মসজিদ, জামে মসজিদ ও মাজারগুলোতে জুমার খুতবার জন্য অভিন্ন বিষয় নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। এ উদ্দেশ্যে ধর্মীয় পণ্ডিত, মুফতি, ইমাম ও খতিবদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
বোর্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ধর্মীয় সচেতনতা, নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি, ঐক্য এবং সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
কিন্তু প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর সমালোচনা শুরু হয়। মুতাহিদা মজলিসে উলামা নামের ধর্মীয় সংগঠনগুলোর একটি জোটের প্রতিনিধিরা বলেন, খুতবার বিষয়বস্তু নির্ধারণের দায়িত্ব ধর্মীয় পণ্ডিতদের; প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের নয়। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী মেহবুবা মুফতিও উদ্যোগটির সমালোচনা করেন। তাঁদের আপত্তির মূল বিষয় হলো, অভিন্ন বিষয় নির্ধারণের উদ্যোগ ভবিষ্যতে ধর্মীয় বক্তব্যের স্বাধীনতা সীমিত করার উপায় হয়ে উঠতে পারে কি না।
অন্যদিকে, ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ দারাখশান আন্দ্রাবি বলেছেন, খুতবা বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কোনো আদেশ জারি করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় নেতারা নিজেদের মতো করে বক্তব্যের বিষয় নির্ধারণ করতে পারবেন। ফলে প্রস্তাবিত সমন্বয় কমিটির ভূমিকা এবং খুতবার বিষয় নির্ধারণে তার ক্ষমতার সীমা বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের নিবন্ধে ২০২৩ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের দাবি, সে সময় কাশ্মীরের জুমার খুতবায় ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ উল্লেখের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। ফিলিস্তিনের জন্য দোয়া করতে হলে তা কাশ্মীরি ভাষার পরিবর্তে আরবি ভাষায় করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
লেখকের ব্যাখ্যা, কাশ্মীরের অনেক মানুষ ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান। এ কারণে স্থানীয় ভাষায় ফিলিস্তিনের জন্য দোয়া বা বক্তব্য মানুষের কাছে রাজনৈতিক প্রতিবাদের বার্তা হিসেবেও প্রতিভাত হতে পারে।
এখানে ভাষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আরবিতে উচ্চারিত দোয়ার অর্থ অনেক মুসল্লি পুরোপুরি না বুঝলেও স্থানীয় ভাষায় একই বক্তব্যের অর্থ সরাসরি তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারে। লেখকের মতে, ধর্মীয় বক্তব্যের ভাষা নিয়ন্ত্রণের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ কাজ করতে পারে।
তবে ২০২৩ সালের কথিত নির্দেশের সুনির্দিষ্ট সরকারি নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সমসাময়িক প্রতিবেদন ছাড়া এ অভিযোগকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
কাশ্মীরের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় শিয়া মুসলমানদের মুহাররমের মিছিলের বিষয়টিও এসেছে। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের নিবন্ধ অনুযায়ী, শ্রীনগরে ১৯৮৯ সালে আইনশৃঙ্খলার কারণ দেখিয়ে প্রধান মুহাররমের মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে মিছিল পুনরায় আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে অনুমতির সঙ্গে কিছু শর্ত যুক্ত ছিল বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের উসকানিমূলক বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে বিবেচিত বার্তা এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতীক প্রদর্শন থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছিল।
শিয়া মুসলমানদের কাছে কারবালার ঘটনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। লেখকের মতে, কাশ্মীরের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এই ধর্মীয় স্মৃতির মিল খোঁজার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। ফলে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় কোন বক্তব্য বা প্রতীক ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়।
নিবন্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার-সমর্থিত কিছু ধর্মীয় বক্তার মাধ্যমে কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে শান্তি ও উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। লেখকের মতে, এতে সামরিক উপস্থিতি, গ্রেপ্তার, বাড়িঘর ভাঙা এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংক্রান্ত অভিযোগ আলোচনার বাইরে থেকে যেতে পারে।
কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, নিবন্ধটির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে সেই ইতিহাস।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, কাশ্মীরের ধর্মীয় সম্পদ পরিচালনার ব্যবস্থা একসময় সম্প্রদায়ভিত্তিক ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পরে রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় সরকারের প্রভাব বাড়ে। ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদায় পরিবর্তন এবং পুনর্গঠনের পর কেন্দ্রীয় ওয়াকফ আইনের অধীনে বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের আগস্টে ওয়াকফ বোর্ড পুলিশের সহায়তায় কয়েকটি মাজারে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত দানবাক্স সরিয়ে দেয়। বোর্ডের যুক্তি ছিল অনৈতিক চর্চা বন্ধ করা এবং স্বচ্ছতা বাড়ানো। কিন্তু লেখকের মতে, এ পদক্ষেপ ধর্মীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনায় কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত করার আরেকটি উদাহরণ।
শ্রীনগরের ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদ বারবার বন্ধ থাকার ঘটনাও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের দৃষ্টিতে, ধর্মীয় স্থানে প্রবেশ সীমিত করা এবং খুতবার বিষয় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ একই ধরনের প্রশাসনিক ক্ষমতার ভিন্ন প্রকাশ।
টিআরটি ওয়ার্ল্ডের নিবন্ধে বলা হয়েছে, কাশ্মীরের মুসলমানদের ধর্মীয় বক্তব্য নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ শুধু বর্তমান সরকারের সময়ের ঘটনা নয়।
লেখক কয়েক দশক আগের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, রাষ্ট্রীয় রেডিও কাশ্মীরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রিত একজন ধর্মীয় বক্তাকে বদর যুদ্ধের ঘটনা বাদ দিতে বলা হয়েছিল। প্রাথমিক মুসলিম সম্প্রদায়ের তুলনামূলক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিজয়ের এই ইতিহাসকে কাশ্মীরের মানুষ সমসাময়িক রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে নির্দেশটি দেওয়া হয়েছিল বলে লেখক মনে করেন।
নিবন্ধকারের সামগ্রিক যুক্তি হলো, কাশ্মীরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু উপাসনার স্থান নয়; সেগুলো মানুষের সামাজিক যোগাযোগ, মতপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রও। এ কারণে ধর্মীয় বক্তব্যের ওপর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কাশ্মীরে জুমার খুতবার অভিন্ন বিষয় নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কটি মূলত দুটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রথমত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের বৈধ সীমা কোথায়? দ্বিতীয়ত, এ ধরনের উদ্যোগ ধর্মীয় পণ্ডিতদের স্বাধীনভাবে বক্তব্য দেওয়ার অধিকারকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে?
ওয়াকফ বোর্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্যোগটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে সমন্বিত আলোচনা উৎসাহিত করার জন্য। সমালোচকদের আশঙ্কা, প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত বিষয় ভবিষ্যতে ধর্মীয় বক্তব্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপায় হতে পারে।
বোর্ড বাধ্যতামূলক নির্দেশ জারির কথা অস্বীকার করায় প্রস্তাবের প্রকৃত পরিধি ও বাস্তব প্রয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কমিটির সুপারিশ কতটা বাধ্যতামূলক হবে, ধর্মীয় বক্তারা ভিন্ন বিষয় বেছে নিতে পারবেন কি না এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই বিতর্কটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
কাশ্মীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মীয় পরিচয়, স্থানীয় ভাষা, মতপ্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সম্পর্ক জটিল। তাই সাম্প্রতিক উদ্যোগটির মূল্যায়নে একদিকে বোর্ডের ঘোষিত উদ্দেশ্য, অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উত্থাপিত উদ্বেগ—দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ডে প্রকাশিত আহমেদ বিন কাসিমের মতামতধর্মী নিবন্ধ এবং খুতবার অভিন্ন বিষয় নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে সাম্প্রতিক সংবাদপ্রতিবেদন।
আরো পড়ুন : ভারতে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক, ব্যবহৃত সফটওয়্যার পর্যালোচনার নির্দেশ