ইথান হক
সংগীতের সুরে ছবি আঁকা যায়, আবার গল্পের মধ্য দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায় একজন শিল্পীকে আরেকজনের সঙ্গে। এই দুইয়ের সঙ্গে যখন যুক্ত হয় ভ্রমণ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং নানা সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা, তখন একটি পরিবেশনা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক শিল্পযাত্রা। ফরাসি শিল্পীদল ‘লে ভোয়ায দ্য রেজে’ ঢাকায় এমনই এক অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে দর্শকদের।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দলটির পরিবেশনায় একসঙ্গে মিশেছে সংগীত, সরাসরি চিত্রাঙ্কন, লাইভ ভিডিও ও গল্প বলা। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। দলটির চার সদস্যের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা শিল্পীসত্তা। কিন্তু মঞ্চে তাঁদের কাজ বিচ্ছিন্ন নয়। একজনের সুরে অন্যজনের ছবি, একজনের গল্পে অন্যজনের পরিচয়—এভাবেই এগিয়ে চলে পরিবেশনা।
দলটির চার সদস্য হলেন রেজে, সোফ্রাঁ, এমদে ও ক্রিস্তো। সংগীত, ছন্দ, ছবি ও দৃশ্যকল্পের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করলেও তাঁদের লক্ষ্য এক—দর্শককে পরিচিত জগতের বাইরে এক কল্পনাময় যাত্রায় নিয়ে যাওয়া।
রেজের প্রকৃত নাম রেমি পেকু। তিনি গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও গিটারশিল্পী। ফ্রান্সের গ্রেনোবল অঞ্চলে তাঁর জন্ম। বিশ বছর বয়সে তিনি পশ্চিম আফ্রিকার পথে বেরিয়ে পড়েন। সেই যাত্রায় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শিল্পী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতভাবনাকে সমৃদ্ধ করে। পরে তিনি ফ্রান্সে জ্যাজ গিটারের শিক্ষা নেন। এরপর ব্রাজিলের সালভাদর দা বাহিয়ায় গিয়ে সেখানকার সংগীতধারার সঙ্গে পরিচিত হন। তুরস্কের ইস্তাম্বুল ও লেবাননের বৈরুতেও তিনি সংগীতের বিভিন্ন ঐতিহ্যের সংস্পর্শে আসেন। তাঁর গিটার ও কণ্ঠে এসব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়। আফ্রিকান, ব্রাজিলীয় ও অন্যান্য সংগীতধারার প্রভাব তাঁর পরিবেশনাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। পরিচিত সুরের পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব রচনাও এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সোফ্রাঁর প্রকৃত নাম ফ্রাঁসোয়া ব্রসিয়ে। তিনি পারকাশনশিল্পী ও কণ্ঠশিল্পী। তাঁর বাদ্যযন্ত্রের ছন্দ গিটার ও গানের সঙ্গে তৈরি করে সংগীতের প্রাণবন্ত ভিত্তি। আফ্রিকান, আফ্রো-কিউবান ও ব্রাজিলীয় ছন্দের নানা উপাদান তাঁর সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত। তিনি শুধু তাল ধরে রাখেন না; ছন্দের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গানের আবহও গড়ে তোলেন। তাঁর কণ্ঠের সংযোজন পরিবেশনাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
রেজের সঙ্গে তাঁর সংগীতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দুই শিল্পীর পারস্পরিক বোঝাপড়া এই পরিবেশনার অন্যতম ভিত্তি।
এমদের প্রকৃত নাম দাভিদ মাগলি। তিনি চিত্রশিল্পী। তাঁর বিশেষত্ব হলো, সংগীত চলার সময়ই তিনি ছবি আঁকেন। সেই ছবি সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় দেখানো হয়। কোনো গান শুরু হলে তার আবহ, বক্তব্য ও ছন্দের সঙ্গে মিল রেখে তাঁর আঁকার রেখা বদলাতে থাকে। কখনো মানুষের অবয়ব, কখনো কোনো স্থান, কখনো আবার দুটি মানুষের সাক্ষাতের দৃশ্য ফুটে ওঠে। একটি গানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছবিও যেন নিজের গল্প তৈরি করে। তাঁর শিল্পের বিশেষ দিক হলো তাৎক্ষণিক সৃষ্টি। আগে থেকে তৈরি কোনো ছবি দেখানো হয় না। দর্শক নিজের চোখের সামনেই ছবির জন্ম ও পরিবর্তন দেখতে পান। ফলে চিত্রাঙ্কনও সংগীতের মতোই সরাসরি পরিবেশনার অংশ হয়ে ওঠে।
ক্রিস্তোর প্রকৃত নাম ক্রিস্তিন দুরোঁ। তিনি আলোকচিত্রশিল্পী, মঞ্চপরিচালনা ও প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত। পরিবেশনায় ভিডিও, এবং মঞ্চের সামগ্রিক বিন্যাসে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এমদের আঁকা ছবি দর্শকের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি দৃশ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও তাঁর কাজের অংশ। সংগীত ও চিত্রাঙ্কনের সঙ্গে দৃশ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে তিনি পরিবেশনার দৃশ্যমান জগৎ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। কণ্ঠের মাধ্যমেও তিনি দলের পরিবেশনায় অংশ নেন।
এমদে যেখানে চোখের সামনে ছবি আঁকেন, ক্রিস্তো সেখানে সেই ছবিকে বৃহত্তর দৃশ্যকল্পের সঙ্গে যুক্ত করেন। দুই শিল্পীর কাজের সমন্বয়ে একটি গান শুধু শোনার বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে দেখার ও অনুভব করার অভিজ্ঞতা।
দলটির পরিবেশনার অন্যতম আকর্ষণ হলো শিল্পীদের পরস্পরের পরিচয় তুলে ধরার ধরন। তাঁরা শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেদের নাম ও কাজের বিবরণ দেন না। গল্পের প্রবাহের মধ্যে একজন আরেকজনকে পরিচয় করিয়ে দেন। ফলে দর্শক চারজন শিল্পীর ব্যক্তিগত ভূমিকার পাশাপাশি তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কও বুঝতে পারেন।
এই পদ্ধতির সৌন্দর্য হলো, পরিচয়পর্ব আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিকতায় আটকে থাকে না। গল্প এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের কাজ ও ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক সামনে আসে। দর্শক বুঝতে পারেন, কে সুর তৈরি করছেন, কে সেই সুরে ছন্দ যোগ করছেন, কে ছবির মাধ্যমে গল্পকে দৃশ্যমান করছেন, আর কে দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে পুরো অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে গাঁথছেন।
এখানে শিল্পীরা যেন পরস্পরের কাজের ব্যাখ্যাকারীও। একজনের পরিচয় অন্যজনের কথায় ও কাজের সূত্রে প্রকাশ পায়। এতে মঞ্চে চারজন আলাদা শিল্পীর উপস্থিতি একটি সম্মিলিত গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সরাসরি ছবি আঁকার সময় এই বিন্যাস আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। সংগীতের মধ্যে গল্প এগোয়, ছবিতে তার দৃশ্যরূপ তৈরি হয়, আর শিল্পীদের পারস্পরিক যোগাযোগ দর্শককে সেই সৃষ্টির প্রক্রিয়ার কাছাকাছি নিয়ে যায়। ফলে দর্শক শুধু তৈরি হওয়া শিল্পকর্ম দেখেন না; কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পভাষা একসঙ্গে কাজ করে, সেটিও প্রত্যক্ষ করেন।
‘লে ভোয়ায দ্য রেজে’র শিল্পভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ভ্রমণ ও মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ। তাদের কাছে ভ্রমণ মানে শুধু নতুন কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো নয়। পরিচিত অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা, অন্য সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং পৃথিবীকে নতুন দৃষ্টিতে দেখাও এর অংশ।
দলটির পরিবেশনার একটি গল্পে রয়েছে এক পরিযায়ী পাখির কথা। পাখিটি দীর্ঘ যাত্রার পর নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে এসে দেখে, সেই পরিচিত পরিবেশে সে আর আগের মতো মানিয়ে নিতে পারছে না। কেউ তার প্রত্যাবর্তন লক্ষ করে না। আবার চলে যেতে চাইলেও পরিস্থিতি তাকে থেকে যেতে বাধ্য করে।
এই গল্পে যাত্রা ও প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি রয়েছে নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার প্রশ্ন। কোথাও ফিরে এলেই যে সেখানে নিজের পুরোনো অবস্থান ফিরে পাওয়া যায় না, সেই অভিজ্ঞতাও এতে প্রকাশ পায়।
দলটির আরেকটি প্রযোজনার নাম ‘ভোয়ায ও কোঁ দ্য লা রু’। এর ভাবার্থ, রাস্তার মোড় থেকে যাত্রা। এই প্রযোজনায় সাধারণ জীবনের ঘটনা, মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং পরিচিত দৃশ্যের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের বিষয় উঠে আসে। শিল্পীদের দর্শন অনুযায়ী, পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে সব সময় দূরদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের আশপাশের মানুষ ও পরিবেশের প্রতিও কৌতূহলী হওয়া যায়। সেই কৌতূহল থেকেই শুরু হতে পারে এক নতুন যাত্রা।
মঞ্চ পরিবেশনার বাইরেও নিজেদের শিল্পভাবনা ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে দলটির সঙ্গে যুক্ত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘লে প্রোদ্যুকসিওঁ দ্য বাজার’। তাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সংগীত, চিত্রাঙ্কন ও গল্প বলার সমন্বয়ে একটি চিত্রসমৃদ্ধ বই প্রকাশ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে সরাসরি মঞ্চে তৈরি হওয়া শিল্পানুভূতিকে বইয়ের পাতায় ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির ভাবনায় রয়েছে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ, অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা এবং দৈনন্দিন জীবনের সৌন্দর্য। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে মঞ্চশিল্প ও প্রকাশনার মধ্যে সংযোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। দর্শক শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিবেশনা দেখেই অভিজ্ঞতা শেষ করেন না। বইয়ের মাধ্যমে সেই শিল্পভাবনার সঙ্গে পরে আবারও যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
দলটির শিল্পচর্চা বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের যোগাযোগের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছে। ফ্রান্সের বাইরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, ব্রাজিল, এল সালভাদরসহ একাধিক স্থানে তাদের পরিবেশনা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে তাদের বাংলাদেশে আসা।
সংগীত, ছবি ও গল্পের সমন্বিত পরিবেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ভাষাগত সীমাবদ্ধতা তুলনামূলকভাবে কম। দর্শক কোনো গানের প্রতিটি শব্দ না বুঝলেও সুরের আবেগ ও ছবির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিবেশনার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—বিভিন্ন বয়সের দর্শকের কাছে এ ধরনের পরিবেশনা পৌঁছানোর সুযোগও রয়েছে।
রেজের গিটার ও কণ্ঠ, সোফ্রাঁর ছন্দ, এমদের তাৎক্ষণিক চিত্রাঙ্কন এবং ক্রিস্তোর দৃশ্যকল্প—চারটি আলাদা শিল্পভাষা মিলে তৈরি করে ‘লে ভোয়ায দ্য রেজে’র নিজস্ব জগৎ।
এই পরিবেশনার শক্তি শুধু সংগীত ও ছবির অভিনব সমন্বয়ে নয়। এর মধ্যে রয়েছে একে অন্যকে জানার, পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এবং পারস্পরিক সৃষ্টিশীলতাকে জায়গা দেওয়ার আনন্দ।
একজন শিল্পী সুর দিয়ে যে অনুভূতির সূচনা করেন, অন্যজন তা ছন্দে এগিয়ে নেন। কেউ সেই অনুভূতিকে ছবিতে রূপ দেন, কেউ আবার দৃশ্যের বিন্যাসে তাকে আরও বিস্তৃত করেন। গল্পের মধ্য দিয়ে তাঁদের পরিচয় ও সম্পর্ক দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়। ফলে দর্শক এখানে চারজন শিল্পীর আলাদা পরিবেশনা দেখেন না; দেখেন কীভাবে চারজন মিলে একটি শিল্পকর্ম তৈরি করেন। সুর, ছবি ও গল্পের এই সম্মিলিত যাত্রাই ‘লে ভোয়ায দ্য রেজে’র পরিবেশনাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ১৩ই অক্টোবরের আয়োজনেও শিল্পের এই বহুমাত্রিক প্রকাশ দেখা গেছে। ফরাসি আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং পরিবেশনা-পরবর্তী দর্শক-শিল্পী মতবিনিময় অনুষ্ঠানটিকে শুধু মঞ্চকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং তা বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও ভাববিনিময়ের সুযোগ তৈরি করেছে।
আরো পড়ুন : রেইউনিয়নের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘মারমাঈ’, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে বিশেষ প্রদর্শনী