কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণ, প্রতিবাদ বিআইপির

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি এলাকায় চলমান উপকূলীয় সড়ক নির্মাণকাজ

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে সড়ক নির্মাণের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটি চলমান নির্মাণকাজ অবিলম্বে বন্ধ করে প্রকল্পটির পরিবেশগত, জলবায়ুগত ও পরিকল্পনাগত প্রভাব নতুন করে মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত উপকূলীয় সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে কক্সবাজার পৌরসভা বাস্তবায়িত নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটিতে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়ন রয়েছে।

বিআইপির অভিযোগ, সড়ক নির্মাণের জন্য সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট, সমতল বা অপসারণ করা হচ্ছে। সংগঠনটির মতে, কক্সবাজারের বালিয়াড়ি, উপকূলীয় উদ্ভিদ এবং প্রাকৃতিক বালুর স্তর শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়; এগুলো উপকূলকে ঢেউ, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ক্ষয়ের প্রভাব থেকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

বালিয়াড়ি একই সঙ্গে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। ফলে এসব প্রাকৃতিক কাঠামো নষ্ট হলে তা শুধু পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে না, দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারের উপকূলীয় সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতাও দুর্বল করতে পারে বলে মনে করছে বিআইপি।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্যের সঙ্গেও বর্তমান নির্মাণপদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনাবিদদের সংগঠনটি।

বিআইপির বক্তব্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকার ভাঙন মোকাবিলা এবং পর্যটকদের চলাচলের সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে যদি সৈকতের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়, তাহলে প্রকল্পটির পরিকল্পনাগত যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সংগঠনটি বলছে, সংবেদনশীল বালিয়াড়ি অঞ্চল এড়িয়ে অন্য কোনো স্থানে সড়ক নির্মাণের সুযোগ ছিল কি না, কিংবা ভিন্ন নকশার মাধ্যমে একই অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না—এসব বিষয় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

উপকূলীয় অবকাঠামো পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সড়ক নির্মাণের তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়া গেলেও সেটি যদি দীর্ঘমেয়াদে সৈকতের ক্ষয় বাড়িয়ে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই ক্ষতি মোকাবিলায় আরও বেশি সরকারি অর্থ ও অবকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে।

কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা  ইসিএ-তে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত আইন, বিধিবিধান ও অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিআইপি প্রশ্ন তুলেছে, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না।

সংগঠনটির মতে, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন ও মূল্যায়ন ছাড়া সংবেদনশীল উপকূলীয় এলাকায় নির্মাণকাজ পরিচালিত হলে তা আইনগত ও পরিবেশগত বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তবে প্রকল্পটির পরিবেশগত অনুমোদনের বর্তমান অবস্থা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং নির্মাণকাজের অনুমোদিত নকশা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি। একই সঙ্গে এটি দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ার প্রেক্ষাপটে সৈকতের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

বিআইপি মনে করছে, কক্সবাজারের উন্নয়নকে শুধু সড়ক বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। পরিবহনব্যবস্থা, পর্যটন, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে না দেখে অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। কারণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কংক্রিটের অবকাঠামোর তুলনায় কম খরচে এবং দীর্ঘমেয়াদে উপকূলকে রক্ষা করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে চলমান নির্মাণকাজ অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে বিআইপি। একই সঙ্গে প্রকল্পটির পরিবেশগত, জলবায়ুগত, দুর্যোগ ঝুঁকি এবং সামগ্রিক পরিকল্পনাগত প্রভাব স্বাধীনভাবে ও সমন্বিতভাবে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

পুনর্মূল্যায়নে বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে বিকল্প স্থান এবং বিকল্প নকশা বিবেচনার কথাও বলেছে তারা। এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিআইপিসহ পরিবেশবিদ, পরিকল্পনাবিদ এবং অন্যান্য অংশীজনের আলোচনার দাবি জানানো হয়েছে।

বিআইপির মতে, পুনর্মূল্যায়নের পর যদি প্রকল্পটি পরিবেশ ও উপকূলীয় সুরক্ষার জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটি বাতিল করে পরিবেশসম্মত ও টেকসই বিকল্প গ্রহণ করা উচিত।

সংগঠনটি একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের প্রবণতারও সমালোচনা করেছে।

কক্সবাজারের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি সড়ক নির্মাণের নয়। প্রশ্ন হলো—পর্যটন ও নগর উন্নয়নের জন্য যে উপকূলকে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা অক্ষুণ্ণ রাখা যাবে। বিআইপির অবস্থান হলো, কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় পরিবেশকে উন্নয়নের বাইরে নয়, বরং উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *