বিজয় মজুমদার
ভারতের রাজনীতিতে এমন একটি দলের উত্থান ঘটেছে, যার কোনো নির্বাচনী নিবন্ধন নেই। প্রচলিত অর্থে এটি রাজনৈতিক দলও নয়। নাম ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। একটি বিতর্কিত মন্তব্য, একটি মীম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ থেকে যার যাত্রা শুরু।
কয়েক মাসের মধ্যেই সেই ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ পরিণত হয়েছে বড় যুব আন্দোলনে। দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ৩৬ দিনের বিক্ষোভের পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এখন আবার রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। ৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে নতুন করে মিছিল করার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
ককরোচ জনতা পার্টির জন্ম ২০২৬ সালের ১৫ই মে। সেদিন ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিচারপতি অনলাইনে সক্রিয় কিছু বেকার তরুণ ও ভুয়া যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ শব্দ ব্যবহার করেন। মন্তব্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
পরে প্রধান বিচারপতি বলেন, তাঁর বক্তব্যকে বৃহত্তর তরুণ সমাজের বিরুদ্ধে মন্তব্য হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মানুষ। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তেলাপোকা’ শব্দটি নতুন অর্থ পেয়ে গেছে।
তরুণদের একটি অংশ বিদ্রূপকে নিজেদের পরিচয়ে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
স্লোগান ওঠে—‘ম্যায় ভি ককরোচ’, অর্থাৎ ‘আমিও তেলাপোকা’।
পরদিন, ১৬ই মে, ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে এই প্রতিক্রিয়াকে সংগঠিত রূপ দেন। তিনি ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সামনে আসেন। তাঁর আগে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমদিকে উদ্যোগটি ছিল মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্রচারণা।
কিন্তু খুব দ্রুত এর বিস্তার ঘটে। তরুণরা নিজেদের ‘ককরোচ’ পরিচয়ে যুক্ত হতে থাকে। তেলাপোকার প্রতীক হয়ে ওঠে আন্দোলনের পরিচয়।
সিজেপি নিজেকে তরুণদের দ্বারা পরিচালিত একটি জনচাপ তৈরির আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে। সংগঠনটি এখনো ভারতের নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এই নামের মধ্যেই রয়েছে আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ।
যে শব্দ দিয়ে তরুণদের অপমান করা হয়েছে বলে তারা মনে করে, সেটিকেই তারা নিজেদের শক্তির প্রতীক করেছে। তেলাপোকা কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকে। সিজেপির ভাষ্যে এটিই তাদের প্রতীকী শক্তি।
তাদের বার্তা হলো, তরুণদের উপেক্ষা করা গেলেও তাদের কণ্ঠ থামানো যাবে না।
সিজেপির প্রচারে ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠ’ ধরনের স্লোগান ব্যবহৃত হয়েছে। সংগঠনটি নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ও তরুণকেন্দ্রিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরছে।
আন্দোলনের প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর।
ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা NEET-UG ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সিজেপি তখন অনলাইন ব্যঙ্গের জায়গা থেকে রাস্তায় নামে।
দিল্লির যন্তর মন্তর হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্র। ভারতের বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের দাবির মধ্যে ছিল পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এবং অনিয়মের জন্য জবাবদিহি।
দিল্লিতে সিজেপির নেতৃত্বে আন্দোলন প্রায় ৩৬ দিন চলে।
এর মধ্যে আন্দোলনটি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন অধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনের সমর্থনে ২৬ দিনের অনশনও করেন। তাঁর অনশন আন্দোলনকে নতুন করে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে।
শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগ ছিল আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি।
সিজেপি এটিকে নিজেদের বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখে। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতার পর আন্দোলন সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়।
সিজেপির আন্দোলন থেমে যায়নি।
সংগঠনটির অভিযোগ, ২৫ জুলাই আন্দোলন প্রত্যাহারের সময় সরকার যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, তার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশেষ করে তিনটি বিষয় নিয়ে তারা অসন্তুষ্ট।
প্রথমত, NEET-সংক্রান্ত ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ।
দ্বিতীয়ত, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা এফআইআর প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।
তৃতীয়ত, আন্দোলনের সময় পুলিশের আচরণের জন্য দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
সিজেপির দাবি, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সরকার বিলম্ব করছে।
এই অবস্থায় আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি।
এবারের মিছিল শুরু হবে ইন্ডিয়া গেট থেকে। গন্তব্য নিউ দিল্লি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। সংগঠনটি জানিয়েছে, নিহত NEET পরীক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্য এবং পুলিশের কথিত নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা মিছিলের সামনে থাকবেন। এরপর শিক্ষার্থী ও তরুণ সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
কর্মসূচির মূল বার্তা—‘Keep Your Word’, অর্থাৎ ‘প্রতিশ্রুতি রাখুন’।
এবারের আন্দোলন যন্তর মন্তরকেন্দ্রিক নয়। এর লক্ষ্য সরাসরি দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তর।
ককরোচ জনতা পার্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর জন্মপ্রক্রিয়া। এটি কোনো পুরোনো রাজনৈতিক সংগঠন থেকে তৈরি হয়নি। কোনো নির্বাচনী ইশতেহার দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল একটি মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভ থেকে।
তারপর মীম এসেছে। এসেছে প্রতীক। এসেছে অনলাইন সদস্য সংগ্রহ। এরপর সেই ভার্চুয়াল ক্ষোভ রাজপথে নেমেছে। আন্দোলন ছড়িয়েছে দেশের বিভিন্ন শহরে। শেষ পর্যন্ত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগও ঘটেছে।
তবে এখানেই সিজেপির সামনে বড় প্রশ্নও রয়েছে। এটি কি কেবল একটি ব্যঙ্গাত্মক যুব আন্দোলন হয়ে থাকবে? নাকি ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে স্থায়ী শক্তিতে পরিণত হবে?
প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এখনই নির্বাচনী রাজনীতিতে যাওয়ার পরিকল্পনা নাকচ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আপাতত লক্ষ্য নির্বাচনে লড়াই নয়। লক্ষ্য তরুণদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনা।
ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান ভারতের শাসক দল বিজেপির জন্য প্রচলিত বিরোধী রাজনীতির মতো চ্যালেঞ্জ নয়। এটি কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। নির্বাচনে প্রার্থীও দিচ্ছে না।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া ক্ষোভ কীভাবে দ্রুত সংগঠিত রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, সিজেপি তার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আর এখানেই ‘ককরোচ’ নামটির রাজনৈতিক তাৎপর্য।
একটি অপমানসূচক শব্দকে তরুণরা নিজেদের পরিচয়ে পরিণত করেছে। সেই পরিচয়কে মীমে ছড়িয়েছে। মীমকে আন্দোলনে পরিণত করেছে। আর আন্দোলনকে নিয়ে গেছে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রের দরজায়।
৫ই সেপ্টেম্বরের মিছিল তাই শুধু আরেকটি বিক্ষোভ নয়।
এটি পরীক্ষা করবে, জুলাইয়ের সাফল্যের পর ককরোচ জনতা পার্টি কতটা শক্তি ধরে রাখতে পেরেছে এবং ভারতের তরুণদের ক্ষোভকে আবার কতটা বড় জনআন্দোলনে পরিণত করতে পারে।