বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য গবেষণা ও চিকিৎসাসেবা দেখলেন কানাডার প্রতিমন্ত্রী

আইসিডিডিআর,বি পরিদর্শনে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই ও প্রতিনিধিদল

কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য রণদীপ সারাই  ১২ই  অক্টোবর ঢাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে উদ্ভাবনী উদ্যোগ সম্পর্কে জানেন।

রণদীপ সারাইয়ের সঙ্গে ছিলেন কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের সদস্যরা এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিংয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল।

আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ ও তাঁর সহকর্মীরা প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। তাঁরা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা, চিকিৎসাসেবা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও উদ্ভাবনের ভূমিকা তুলে ধরেন।

পরিদর্শনের সময় আইসিডিডিআর,বির কাজের প্রশংসা করেন রণদীপ সারাই। তিনি বলেন, ‘আপনারা সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে আছেন।’

পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, জীবনরক্ষাকারী উদ্ভাবনের সুফল যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। কয়েক দশক ধরে আইসিডিডিআর,বি বিশ্বের বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করছে। এসব গবেষণার ফলকে সাশ্রয়ী জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবায় রূপ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি লাখো মানুষের উপকার করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রণদীপ সারাই বলেন, আইসিডিডিআর,বির সঙ্গে কানাডার অংশীদারত্ব গবেষণা, উদ্ভাবন ও জরুরি চিকিৎসাসেবাকে এগিয়ে নিচ্ছে। তাঁর মতে, সুস্থ জনগোষ্ঠীতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরিদর্শনের অংশ হিসেবে প্রতিনিধিদল আইসিডিডিআর,বির ঢাকা হাসপাতাল ঘুরে দেখে। সেখানে বছরে আড়াই লাখের বেশি রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ডায়রিয়ার চিকিৎসা, শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তুলে ধরেন।

প্রতিনিধিদলকে খাবার স্যালাইন যা মুখে খেয়ে শরীরের পানির ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা যায় এর দ্রবণের গুরুত্ব সম্পর্কেও জানানো হয়। ডায়রিয়ায় শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট পানিশূন্যতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় এটি কার্যকর, সহজলভ্য এবং স্বল্পমূল্যের একটি পদ্ধতি। এ চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে আইসিডিডিআর,বির গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শিশুদের ডায়রিয়ার চিকিৎসায় দস্তা ব্যবহারের গবেষণাও প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডায়রিয়ায় পানিশূন্যতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় খাবার স্যালাইন এবং শিশুদের চিকিৎসায় দস্তা ব্যবহারের সুপারিশ করে। বিশ্বব্যাপী ডায়রিয়ার চিকিৎসায় এ দুটি পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রণদীপ সারাইকে বুদ্‌বুদ-চাপযুক্ত অবিরাম শ্বাসসহায়তা পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো হয়। আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবিত এ পদ্ধতি গুরুতর নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের শ্বাস নিতে সহায়তা করে। এটি তুলনামূলক কম খরচে ব্যবহার করা যায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় এ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে সরকারকে সহায়তা করেছে আইসিডিডিআর,বি। কানাডা সরকারের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি কারিগরি পরামর্শ দিয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় শ্বাসসহায়ক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।

গবেষণালব্ধ উদ্ভাবন কীভাবে জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সরাসরি কাজে লাগানো যায়, এ উদ্যোগ তার একটি উদাহরণ।

হাসপাতালের পুষ্টি পুনর্বাসন বিভাগে প্রতিনিধিদলকে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে জানানো হয়। এ চিকিৎসায় রয়েছে রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা, অভিভাবকদের পরামর্শ এবং বিশেষভাবে প্রস্তুত পুষ্টিকর খাবার।

শিশুদের অপুষ্টি মোকাবিলায় আইসিডিডিআর,বির উদ্ভাবিত দুটি উদ্যোগও তুলে ধরা হয়। এর একটি হলো শার্নালি, যা স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপাদান দিয়ে তৈরি চিকিৎসামূলক পুষ্টিকর খাবার। অন্যটি হলো অন্ত্রের অণুজীবের ভারসাম্য ও শিশুর অপুষ্টি নিয়ে গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি বিশেষ পরিপূরক খাবার। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শিশুদের পুষ্টির উন্নতি ঘটানো।

হাসপাতালের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য এবং অধিকারবিষয়ক সেবাও প্রতিনিধিদলকে দেখানো হয়। কানাডার অর্থায়নে পরিচালিত অ্যাডসার্চ প্রকল্পের সহায়তায় এ খাতে গবেষণা ও সেবার ঘাটতি চিহ্নিত করার কাজ চলছে। মায়েদের স্তন্যপানবিষয়ক পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এ উদ্যোগ সহায়তা করছে।

আইসিডিডিআর,বির রোগপ্রতিরোধ ও টিকাবিষয়ক পরীক্ষাগার পরিদর্শনের সময় বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী টিকার ভূমিকা তুলে ধরেন। রোগ প্রতিরোধ ও প্রাণহানি কমাতে টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি প্রতিনিধিদলকে জানান।

আলোচনায় রোহিঙ্গা শিবিরে কলেরার টিকাদান কার্যক্রম, বাংলাদেশে বিভিন্ন টিকাদান অভিযান এবং টিকা নিয়ে আইসিডিডিআর,বির গবেষণার বিষয়গুলো উঠে আসে।

রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ, সময়মতো টিকাদান এবং আগাম জনস্বাস্থ্য উদ্যোগের গুরুত্বও আলোচনায় স্থান পায়। এসব কার্যক্রমে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

রণদীপ সারাইয়ের এ পরিদর্শনে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য গবেষণা ও চিকিৎসাসেবায় কানাডা সরকারের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।

আইসিডিডিআর,বি ১৯৭৮ সাল থেকে কানাডার সহযোগিতা পেয়ে আসছে। ২০০৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে মূল তহবিলও দিয়ে আসছে দেশটি।

এ সহযোগিতার আওতায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জনস্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। গবেষণার ফলকে বাস্তব চিকিৎসাপদ্ধতিতে প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য উন্নয়নেও অবদান রাখছে আইসিডিডিআর,বি।

 

আরো পড়ুন : শিশুদের জীবন বাঁচাতে আইসিডিডিআরবি-এর উদ্যোগে মুগ্ধ ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *