বাংলাদেশে শিশু ও মাতৃ অপুষ্টি, পুষ্টি-গবেষণা এবং কম খরচে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা নিয়ে আইসিডিডিআরবি-এর কাজ সরেজমিনে দেখতে ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে যুক্তরাজ্যের একটি উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় প্রতিনিধিদল।
৪ঠা অক্টোবর যুক্তরাজ্যের অল পার্টি পার্লামেন্টারী গ্রুপ অন নিউট্রিশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর এই প্রতিনিধিদল আইসিডিডিআরবি-এর ঢাকা হাসপাতাল, পুষ্টি গবেষণা কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে।
প্রতিনিধিদলে ছিলেন ইউনাইটেড এগেইনেস্ট ম্যালনিউট্রিশন এন্ড হাঙ্গার (ইউএএমএইচ)-এর প্রধান নির্বাহী লর্ড জোনাথন ওটস, যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য ডেভিড ম্যান্ডেল এমপি, মনিকা হার্ডিং এমপি ও অ্যালান জেমেল এমপি এবং ইউএএমএইচ-এর সিনিয়র উপদেষ্টা মার্থা ভার্নি।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডায়রিয়াজনিত রোগের হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত আইসিডিডিআরবি-এর ঢাকা হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সফরের সময় প্রতিনিধিদল হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) কর্নার, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং পুষ্টি পুনর্বাসন ইউনিট পরিদর্শন করে।
পুষ্টি পুনর্বাসন ইউনিটে প্রতিনিধিদল শিশুদের তীব্র অপুষ্টি বা সিভিয়ার একিউট ম্যালনিউট্রিশন চিকিৎসায় আইসিডিডিআরবি-এর পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারে। এখানে নির্দিষ্ট থেরাপিউটিক ডায়েট, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও কাউন্সেলিংয়ের সমন্বয়ে শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। অনেক শিশু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠে বলে তাদের জানানো হয়।
আইসিইউ-তে প্রতিনিধিদলকে শিশুদের গুরুতর নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কম খরচের ‘বাবল সিপাপ’ প্রযুক্তি সম্পর্কে জানানো হয়। আইসিডিডিআরবি-এর তৈরি এই পদ্ধতি তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়ে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা দিতে পারে। সীমিত সম্পদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এমন প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পরে প্রতিনিধিদল আইসিডিডিআরবি-এর জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব এবং নিউট্রিশন রিসার্চ ডিভিশন-এর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে আইসিডিডিআরবি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমীদ আহমেদ বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে শিশু ও মায়েদের অপুষ্টি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং পুষ্টি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের সীমিত আওতা।
সফর শেষে অ্যালান জেমেল এমপি আইসিডিডিআরবি-এর কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি গত ৬০ বছরে কী করেছে, বর্তমানে কী করছে এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বের জন্য ভবিষ্যতে কী করতে চায়—তা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
লর্ড জোনাথন ওটস বলেন, ঢাকায় এসে আইসিডিডিআরবি-এর গবেষণা, হাসপাতাল এবং নেতৃত্ব সম্পর্কে জানার সুযোগ পাওয়া তার জন্য আনন্দের। তিনি যুক্তরাজ্য ও আইসিডিডিআরবি-এর দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের কথাও উল্লেখ করেন।
১৯৭৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য আইসিডিডিআরবি-এর বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রমে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর গবেষণা কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতেও এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ওটস বলেন, এই সফরের অভিজ্ঞতা যুক্তরাজ্যে ফিরে দেশটির সরকার ও পার্লামেন্টকে আইসিডিডিআরবি-এর চলমান কাজ সম্পর্কে জানাতে তারা ব্যবহার করবেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্য ও আইসিডিডিআরবি-এর পুরোনো অংশীদারিত্ব নতুন করে গড়ে তোলার আশার কথাও জানান।
ড. তাহমীদ আহমেদ বলেন, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাজ্য আইসিডিডিআরবি-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহায়তা করেছে। এসব গবেষণা ও উদ্ভাবন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রেখেছে। পুষ্টি ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা যখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন এই সফর নতুন করে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অল পার্টি পার্লামেন্টারী গ্রুপ অন নিউট্রিশন ফর ডেভেলপমেন্ট যুক্তরাজ্যে পুষ্টিকে রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ধরে রাখা এবং বিশ্বজুড়ে অপুষ্টি মোকাবিলায় সংসদীয় সমর্থন বাড়াতে কাজ করে।
সফরের আলোচনায় বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের মার্গারিটা কাপালবি, গেইন বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. রুদাবা খন্দকার, সান একাডেমিয়া এন্ড রিসার্চ নেটওয়ার্ক-এর কো-চেয়ার ড. এ এফ এম ইকবাল কবির, কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড-এর ড. শেখ শাহেদ রহমান এবং যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ এবং ডেভেলপমেন্ট অফিস-এর এ বি এম ফিরোজ আহমেদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সফরের শেষে লর্ড ওটস ড. তাহমীদ আহমেদকে যুক্তরাজ্যে অল পার্টি পার্লামেন্টারী গ্রুপ অন নিউট্রিশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর সঙ্গে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানান। এ সময় তাকে একটি স্মারক উপহারও দেওয়া হয়।