আবুল হাশিম: বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও যুক্ত বাংলার স্বপ্নের এক চিন্তক

রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমের প্রতিকৃতি

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে আবুল হাশিম এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁকে শুধু রাজনীতিক হিসেবে দেখলে তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন রাজনীতিক, সংগঠক, আইনজীবী, লেখক ও চিন্তাবিদ। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়, ধর্মীয় মূল্যবোধ, ভাষা ও আঞ্চলিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

১৯০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি বর্ধমান জেলার কাশিয়াড়া গ্রামে জন্ম নেন আবুল হাশিম। তাঁর পিতা আবুল কাশেম ছিলেন বর্ধমানের পরিচিত রাজনৈতিক নেতা ও আইনসভার সদস্য। রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব থেকেই সমাজ ও রাজনীতির নানা প্রশ্ন তাঁর চিন্তার জগতে জায়গা করে নেয়।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। বর্ধমান আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করলেও পেশাজীবন তাঁকে দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারেনি। বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক অবস্থান, কৃষকের দুর্দশা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতা তাঁকে সক্রিয় রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়।

১৯৩০-এর দশকে আবুল হাশিমের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। তিনি বঙ্গীয় আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন। পরে মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বর্ধমান জেলা মুসলিম লীগের নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৩ সালের ৭ই  নভেম্বর তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই দায়িত্ব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

তখন মুসলিম লীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ও অভিজাত নেতৃত্বের উপস্থিতি ছিল প্রবল। আবুল হাশিম দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্তৃত করার চেষ্টা করেন। জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলা হয়। তরুণ কর্মীদের রাজনৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। গ্রামাঞ্চলেও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ে।

এই সময় বঙ্গীয় মুসলিম লীগ দ্রুত একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের বড় বিজয়ের পেছনে সংগঠক হিসেবে আবুল হাশিমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আবুল হাশিমের রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা। তিনি এটিকে শুধু একটি কেন্দ্রীভূত পাকিস্তানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি হিসেবে দেখেননি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন। বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর চিন্তা সেখান থেকে নতুন মাত্রা পায়। এই জায়গাতেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে বাংলার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তার প্রশ্ন যুক্ত হয়।

আবুল হাশিমের রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক সাম্য। তিনি মনে করতেন, ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত ধর্মাচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে এর সামাজিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

‘রব্বানিয়াত’ ছিল তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সম্পদের সামাজিক দায়িত্ব, মানুষের মর্যাদা, অর্থনৈতিক সাম্য এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। এ কারণে তাঁর চিন্তার সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ভাবনার কিছু মিল দেখা গেলেও তিনি মার্কসবাদকে গ্রহণ করেননি। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি তাঁর কাছে নৈতিক ও আত্মিক বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৪৫ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের খসড়া ইশতেহারে তাঁর চিন্তার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান সুযোগ, বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, জমিদারি প্রথার বিলোপ, কৃষকের অধিকার, শ্রমিকের অধিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পরিবহনের রাষ্ট্রীয় মালিকানার মতো বিষয় সেখানে স্থান পেয়েছিল।

অর্থাৎ তাঁর কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ শুধু শাসকের পরিবর্তন ছিল না। মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিও ছিল স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আবুল হাশিমের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় যুক্ত ও স্বাধীন বাংলার উদ্যোগ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সম্ভাবনা যখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, তখন বাংলা ভাগের বিরোধিতা করে একটি স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলার ধারণা সামনে আসে। আবুল হাশিম এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসুসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে তিনি এই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের ধারণায় বাংলা শুধু একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়। ভাষা, ইতিহাস, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ড।

১৯৪৭ সালের মে মাসে আবুল হাশিম ও শরৎচন্দ্র বসু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সোদপুরে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে হিন্দু-মুসলমানের অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অখণ্ড বাংলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত থাকবে। যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী, প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার বিভিন্ন প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।

শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হয়। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ এবং পশ্চিম বাংলা ভারতের অংশ হয়ে যায়।

দেশভাগ আবুল হাশিমের রাজনৈতিক চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। পশ্চিমবঙ্গে তিনি কিছু সময় বিরোধী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। পরে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। পাকিস্তানের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন, রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় মানুষের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নকে মুছে দিতে পারে না।

এই উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে ভাষার প্রশ্নে তাঁর অবস্থানে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আবুল হাশিম সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। পরদিন ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে নামে।

ভাষার অধিকারের আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে আবুল হাশিম গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা। তিনি বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয়কে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ মনে করেননি।

পরে আবুল হাশিম খেলাফতে রব্বানী পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন এবং দলটির নেতৃত্ব দেন। তাঁর ‘রব্বানিয়াত’ ধারণাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার একটি সুসংগঠিত কাঠামো দেওয়ার চেষ্টা করেন। জীবনের পরবর্তী সময়ে তাঁর মনোযোগ আরও বেশি করে জ্ঞানচর্চার দিকে যায়। তিনি ঢাকার ইসলামিক একাডেমির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামি দর্শন, অর্থনীতি, সমাজ ও নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণার একটি পরিসর তৈরিতে তিনি ভূমিকা রাখেন।

তাঁর লেখালেখিতেও এই অনুসন্ধান স্পষ্ট। ইসলাম, রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি ও মানুষের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন চিন্তা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য ক্রিড অব ইসলাম’, ‘অ্যাজ আই সি ইট’, ‘ইন্টিগ্রেশন অব পাকিস্তান’ ও ‘ইন রেট্রোস্পেকশন’। বাংলায় তাঁর ‘রব্বানী দৃষ্টিতে’ গ্রন্থও উল্লেখযোগ্য।

দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও তাঁর জ্ঞানচর্চা থেমে যায়নি। ১৯৬৭ সালে তিনি রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে নিষেধাজ্ঞারও প্রতিবাদ করেন। এতে তাঁর সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়।

আবুল হাশিমের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার বুঝতে হলে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয় ।তিনি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মপ্রতিষ্ঠাকে বাঙালিত্বের বিরোধী হিসেবে দেখেননি। তাঁর চিন্তায় ইসলাম ও বাংলা পরস্পরবিরোধী পরিচয় নয়।

একজন বাঙালি মুসলমান একই সঙ্গে ইসলামের ধর্মীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী এবং বাংলার ভাষা, ভূগোল, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ—এই সমন্বয়ের জায়গাটি তাঁর চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁর কাছে জাগরণ মানে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশ নেওয়া নয়। নিজের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজের সমাজের সমস্যা নিয়ে নিজস্ব চিন্তা তৈরি করা এবং অন্যের তৈরি চিন্তার কাঠামোর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হওয়াও জাগরণের অংশ।

এই কারণে আবুল হাশিমকে শুধু মুসলিম লীগের একজন সংগঠক কিংবা যুক্ত বাংলার একজন প্রবক্তা হিসেবে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না।

১৯৭৪ সালের ৫ই  অক্টোবর ঢাকায় আবুল হাশিমের মৃত্যু হয়।

তাঁর জীবদ্দশায় ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্র একাধিকবার বদলেছে। ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে। পরে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রাম স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে।

এই দীর্ঘ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে আবুল হাশিমের রাজনৈতিক চিন্তাও নানা পর্যায় অতিক্রম করেছে। মুসলিম লীগের গণভিত্তি গড়ে তোলা থেকে শুরু করে সামাজিক ন্যায়, যুক্ত বাংলার ধারণা, ভাষার অধিকার এবং ইসলামি সমাজচিন্তা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন বিশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তাঁর উত্তরাধিকার কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাংলার মানুষের রাজনৈতিক আত্মমর্যাদা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক ন্যায় এবং নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রশ্নে তাঁর অনুসন্ধান আজও আলোচনার বিষয়।

আবুল হাশিমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই—তিনি ধর্মীয় পরিচয়, বাঙালি পরিচয়, সামাজিক ন্যায় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একই চিন্তার পরিসরে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সেই অসমাপ্ত অনুসন্ধানই তাঁকে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বতন্ত্র করে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *