আইএমএফকে বিদায়, কিন্তু সংস্কারের দায় রয়ে গেল

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী

৪ঠা অক্টোবর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যখন বললেন, ‘আইএমএফের কর্মসূচি বাতিল করে দিয়েছি’, কথাটা শুনতে ভালো লাগতেই পারে। বিশেষ করে যারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্তের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে, তাদের কাছে এটি আত্মমর্যাদার ঘোষণা হিসেবেও মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক আবেগটা সরিয়ে একটু পেছনে তাকালে অন্য একটি গল্প দেখা যায়।

এটি শুধু আইএমএফের কঠিন শর্তের গল্প নয়। বরং গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের পরপর তিনটি সরকারের সামনে একই ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশ্ন আসা এবং প্রতিবারই কোনো না কোনো কারণে সেগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার গল্প। আর এখানেই ৪ঠা অক্টোবরের ঘোষণাটির আসল তাৎপর্য।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং রিজার্ভ কমতে থাকে। এর আগে থেকেই ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আদায়, ঋণখেলাপি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছে যায়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি কর্মসূচি পায়। কর্মসূচিটির উদ্দেশ্য শুধু অর্থ দেওয়া নয়; এর সঙ্গে ছিল অর্থনৈতিক সংস্কারের বেশ কিছু শর্ত।

শর্তগুলোর মধ্যে ছিল বিনিময় হারকে আরও বাজারভিত্তিক করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর-ছাড় পর্যালোচনা, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ভর্তুকি কমানো এবং ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ও তদারকি শক্তিশালী করা। আইএমএফের নথিতেই এসব সংস্কারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

কিছু পদক্ষেপ অবশ্যই নেওয়া হয়েছিল। জ্বালানি পণ্যের মূল্য সমন্বয়ের সূত্রভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিনিময় হারকে ধীরে ধীরে আরও নমনীয় করার পদক্ষেপও আসে। কিন্তু সব সংস্কার সমানভাবে এগোয়নি। রাজস্ব আদায় ছিল দুর্বল। ব্যাংক খাতেও দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো পুরোপুরি কাটেনি। অর্থাৎ সমস্যাটা শুধু টাকা পাওয়া বা না-পাওয়ার ছিল না; রাষ্ট্রের ভেতরে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্নও ছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচনী রাজনীতির চাপ না থাকায় তারা এমন কিছু কঠিন সংস্কার করতে পারবে, যা নির্বাচিত সরকারগুলো সাধারণত করতে চায় না। বাস্তবতা অবশ্য এত সরল ছিল না।

২০২৫ সালের এপ্রিলের আইএমএফ মিশন কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। আইএমএফ তখনও রাজস্ব আদায়, আর্থিক খাত, বিনিময় হার এবং কাঠামোগত সংস্কারের অগ্রগতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছিল। পরে মে মাসে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ছাড়ের পথ খুলে যায়। এর সঙ্গে বিনিময় হার ব্যবস্থায় নতুন কাঠামো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের মতো বিষয়ও যুক্ত ছিল।

কিন্তু সমস্যাগুলো থেকে গেল।

২০২৫ সালের নভেম্বরের আইএমএফ মূল্যায়নে বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আদায়, আর্থিক খাতের ঝুঁকি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থার সংস্কারকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়। অর্থাৎ সরকার বদলেছে, কিন্তু সমস্যাগুলো বদলায়নি।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং অর্থনীতির ভেতরের পুরোনো দুর্বলতা।

এপ্রিল ২০২৬-এ আইএমএফের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যাশিত অর্থ ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রাজস্ব ও ব্যাংক খাতের সংস্কারে অগ্রগতি না হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।

২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ নিজেই নতুন একটি আইএমএফ কর্মসূচির অনুরোধ করেছিল। অর্থাৎ তখনও সরকার আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার অবস্থানে ছিল না। বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। আইএমএফও তখন বলেছিল, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও কম রাজস্ব আদায় নতুন করে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

চার মাসের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। ৪ঠা অক্টোবর অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, বাংলাদেশ আইএমএফের কর্মসূচি বাতিল করেছে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করবে। এখন প্রশ্ন হলো—এটি কি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ঘোষণা, নাকি কঠিন সংস্কারের প্রশ্ন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা?

সম্ভবত দুটির কিছুটা।

এখানে আইএমএফকে দেবদূত বানানোরও কোনো কারণ নেই। অর্থনীতি যখন দুর্বল, মূল্যস্ফীতি যখন মানুষের জীবনযাত্রাকে চাপে রাখে এবং প্রবৃদ্ধি কমে যায়, তখন একই সঙ্গে মুদ্রানীতি কঠোর করা, ভর্তুকি কমানো এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চাপ অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি কষ্ট বাড়াতে পারে। সুতরাং আইএমএফের প্রতিটি শর্ত বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম—এমন দাবি করা যায় না।

কিন্তু কয়েকটি বিষয়কে শুধু আইএমএফের শর্ত হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো দরকার। কর প্রশাসনকে কার্যকর করা দরকার। ব্যাংকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা দরকার। ব্যাংক পরিচালনা ও তদারকিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা দরকার। রাষ্ট্রের আর্থিক তথ্য ও নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ানো দরকার।

এসব বাংলাদেশের প্রয়োজন। আইএমএফ না থাকলেও প্রয়োজনগুলো থাকবে।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা হলো আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা। অর্থমন্ত্রী নিউইয়র্কে ডলারভিত্তিক বন্ড, চীনে পান্ডা বন্ড, জাপানে সামুরাই বন্ড এবং দেশে স্থানীয় মুদ্রার বন্ডের কথা বলেছেন।

ধারণাটি খারাপ নয়। বরং শক্তিশালী স্থানীয় বন্ড বাজার বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। এতে ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি গভীর পুঁজিবাজার তৈরি হতে পারে।

কিন্তু বন্ড বাজারকে আইএমএফের সরাসরি বিকল্প ভাবা বিপজ্জনক সরলীকরণ। প্রথম সমস্যা হলো ঋণের খরচ। আইএমএফের অর্থ সাধারণত বাজারভিত্তিক বাণিজ্যিক ঋণের তুলনায় অনেক সস্তা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে একটি দেশের ঋণের সুদের হার নির্ভর করে তার ঝুঁকি, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর।

বাংলাদেশের বর্তমান সার্বভৌম ঋণমান বিনিয়োগযোগ্য মানের নিচে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান ‘বি প্লাস’ বহাল রেখে পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে; মে মাসে ফিচও ‘বি প্লাস’ ঋণমানের সঙ্গে নেতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছিল। অর্থাৎ বাজার থেকে টাকা পাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু সেই টাকা কত সুদে পাওয়া যাবে, সেটিই আসল প্রশ্ন।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো মুদ্রার ঝুঁকি। ডলার বা অন্য বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিলে সেই ঋণ শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রাতেই পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশের টাকা দুর্বল হলে টাকায় হিসাব করা ঋণের বোঝা বেড়ে যাবে। ফলে কম সুদের বৈদেশিক বন্ডও সবসময় সস্তা ঋণ নয়।

তৃতীয় সমস্যা হলো পরিমাণ। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে একটি দেশের প্রথম বন্ড ইস্যু করলেই এত বড় অর্থ পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রথম বন্ডই বাজারের কাছে একটি পরীক্ষা। বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে কতটা বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাসের মূল্য হিসেবে কত সুদ দাবি করে, সেটিই তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বৈদেশিক বন্ড খারাপ—এমন কথা বলা যাবে না। কিন্তু বন্ড দিয়ে রাজস্ব সংস্কারের বিকল্প তৈরি করা যায় না। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি একসময় আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। পরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, ঋণের চাপ, দুর্বল রাজস্ব এবং বিভিন্ন নীতিগত ভুলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বন্ডের দায়ও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২২ সালে দেশটি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ স্থগিত করে এবং আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডে খেলাপি হয়। পরে তাকে আইএমএফের কর্মসূচিতে ফিরতে হয়।

জাম্বিয়াও ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডে খেলাপি হওয়ার পর ঋণ পুনর্গঠনের পথে যায় এবং পরবর্তীতে আইএমএফ কর্মসূচির প্রয়োজন হয়। এই উদাহরণগুলো হলো—বাজার থেকে ঋণ নেওয়া যাবে না, তা নয়। শিক্ষা হলো, ঋণ নেওয়ার সক্ষমতার আগে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আইএমএফ বনাম বন্ড নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ নিজের অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করতে পারছে। —আইএমএফ থাকুক বা না থাকুক কর আদায় বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে এনে কার্যকর করতে হবে।

রাষ্ট্রের অর্থ কোথা থেকে আসবে, কোথায় খরচ হবে এবং সেই অর্থের জবাবদিহি কে করবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও দিতে হবে।

আইএমএফের কর্মসূচি বাতিল করা তাই কোনো অর্থনীতির চূড়ান্ত সমাধান নয়। এটি বড়জোর অর্থ সংগ্রহের একটি পথ বন্ধ করে অন্য পথ খোঁজার সিদ্ধান্ত। সরকার যদি সত্যিই বাজার থেকে অর্থ তুলতে চায়, তাহলে প্রথমে বাজারের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর বাজারের আস্থা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আসে না। আসে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ হিসাব, নিয়ন্ত্রিত ঋণঝুঁকি, পর্যাপ্ত রাজস্ব এবং স্থিতিশীল নীতির মাধ্যমে।

আইএমএফকে বিদায় বলা সম্ভব। কিন্তু আইএমএফ যে সমস্যাগুলোর দিকে আঙুল তুলেছে, সেগুলোকে বিদায় বলা সম্ভব নয়। বরং এখন আইএমএফ না থাকায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটাই শুরু হলো—ঋণদাতার শর্ত ছাড়াই কি আমরা সেই সংস্কারগুলো করতে পারব, যেগুলো শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদেরই প্রয়োজন?

যদি পারি, আইএমএফ ছাড়াও বাংলাদেশ এগোতে পারবে। আর যদি না পারি, তাহলে শুধু ঋণের উৎস বদলাবে—সমস্যা বদলাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *