চট্টগ্রাম–রানং সরাসরি নৌপথ: বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সরাসরি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ নতুন গতি পেয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রানং বন্দরের মধ্যে সরাসরি শিপিং সংযোগ চালুর লক্ষ্যে ১৮ই  আগস্ট দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।

ঢাকায় থাই দূতাবাসের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব সমঝোতা স্মারক সই হয়। একটি এমওইউ সই করেছে থাইল্যান্ডের এফকে লাইন ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ কোম্পানী লিমিটেড  এবং বাংলাদেশের বেঙ্গল ওশেনিক লিমিটেড। অন্যটি সই হয়েছে এফকে লাইন ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ কোম্পানী লিমিটেড এবং সুইফট সি শিপিং লাইনস-এর মধ্যে।

চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশে এফকে লাইন-এর পোর্ট এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বেঙ্গল ওশেনিক লিমিটেড। আর সেলস এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে সুইফট সি শিপিং লাইনস।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ও রানং বন্দরের মধ্যে সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থার তুলনায় পণ্য পৌঁছানোর সময় ও খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও সহজ হবে।

চট্টগ্রাম–রানং সরাসরি নৌযোগাযোগের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম ও রানং বন্দরের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে একটি এমওইউ সই করেছিল। ওই চুক্তিতে বন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, যোগাযোগ, উপকূলীয় নৌপরিবহন এবং বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগে সহযোগিতার কথা বলা হয়।

তবে চুক্তির পরও সরাসরি বাণিজ্যিক শিপিং চালু হতে সময় লেগেছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম–রানং রুটে পণ্য পরিবহন চালু হলে পরিবহন সময় প্রায় ১০ দিন থেকে তিন দিনে নামতে পারে এবং শিপিং ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

পরবর্তী সময়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই রুটটি চালুর বিষয়ে আগ্রহ অব্যাহত ছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ঢাকায় নিযুক্ত থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রানং থেকে চট্টগ্রামে প্রথম চালান পাঠানোর বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন।

২০২৬ সালেও বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে থাই রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার বৈঠকে রানং–চট্টগ্রাম নতুন শিপিং রুট নিয়ে আলোচনা হয়।

বর্তমানে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনে তুলনামূলক দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে হয়। সংশ্লিষ্ট আলোচনায় বলা হয়েছে, প্রচলিত ব্যবস্থায় পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। রানং হয়ে সরাসরি সমুদ্রপথ চালু হলে তা ৪ থেকে ৭ দিনে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে।

রানং বন্দরের ভৌগোলিক অবস্থানও এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। বন্দরটি থাইল্যান্ডের আন্দামান উপকূলে অবস্থিত। এই অবস্থান থেকে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের দিকে তুলনামূলক সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে দূরত্ব ও সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।

থাইল্যান্ডের বন্দর কর্তৃপক্ষ রানংকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। বন্দরে ক্রেন, কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, গুদাম ও জেটি অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সরাসরি নৌপথ চালু হলে শুধু আমদানি নয়, বাংলাদেশি পণ্যের থাইল্যান্ডের বাজারে প্রবেশও সহজ হতে পারে। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যে পরিবহন সময় ও লজিস্টিক ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম–রানং রুট চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতারাও সরাসরি শিপিং সেবা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বৈদ্যুতিক পণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক খাদ্য ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা উঠে আসে।

চট্টগ্রাম–রানং সংযোগকে শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের যোগাযোগের বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে।

রানং–চট্টগ্রাম সংযোগকে বিমসটেক অঞ্চলের সম্ভাব্য সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। বিমসটেক-এর পরিবহন সংযোগ পরিকল্পনায় রানং ও চট্টগ্রামসহ বঙ্গোপসাগরীয় বিভিন্ন বন্দরের মধ্যে উপকূলীয় নৌযোগাযোগের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়েছে।

থাইল্যান্ডের দৃষ্টিতেও রানং গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির পশ্চিম উপকূলের এই বন্দর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। থাইল্যান্ডের বন্দর কর্তৃপক্ষ-এর হিসাবে, বিমসটেক অঞ্চলে প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের বাজার রয়েছে। এর সম্মিলিত অর্থনৈতিক পরিসর ৩.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।

ফলে ১৮ আগস্টের দুটি এমওইউ বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায়ও নতুন একটি সংযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এমওইউ সই হওয়া এবং নিয়মিত বাণিজ্যিক নৌসেবা পুরোপুরি চালু হওয়া এক বিষয় নয়। রুটটি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় বন্দর, কাস্টমস, শিপিং অপারেশন, কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি অনুমোদনের কার্যক্রমও সম্পন্ন করতে হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ করে নিয়মিত সেবা চালু হলেই প্রত্যাশিত সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের সুফল বাস্তবে পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *