অল্টারনেটিভসের ৯ দফা দাবি পেশ

দেশের অবস্থা’ শীর্ষক প্রেস মিটে অল্টারনেটিভসের ৯ দফা দাবি তুলে ধরছেন সংগঠক মাহফুজ আলম।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ‘দেশের অবস্থা’ শীর্ষক এক প্রেস মিটে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে ‘অল্টারনেটিভস’। সংগঠনটির জাতীয় সাংগঠনিক কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, মানবাধিকার, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শ্রম, শিক্ষা ও পরিবেশ খাতে সংস্কারের দাবি জানানো হয়।

প্রেস মিটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ও অল্টারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাইয়ের শহিদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের আন্দোলনের পরও প্রত্যাশিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অল্টারনেটিভসের মূল্যায়ন, দেশে আগের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো বহাল রয়েছে; মূলত সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে। সংগঠনটির আশঙ্কা, পুরোনো ব্যবস্থা নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ, সংগঠিত হওয়া ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অল্টারনেটিভসের ৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—

প্রথমত, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানো এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গ্রেপ্তার হওয়া সবাই এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকেও স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি রয়েছে।

তৃতীয়ত, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও এসআরবি আইন কার্যকরের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, মানবাধিকার সুরক্ষা, জবাবদিহি, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

চতুর্থত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কুইক রেন্টাল এবং অসম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি আমদানি, অলিগার্ক ও বিদেশি কোম্পানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস।

পঞ্চমত, ‘স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা অধ্যাদেশ–২০২৫’ এবং ‘রোগী সুরক্ষা ও প্রতিকার অধ্যাদেশ–২০২৫’ আইন হিসেবে প্রণয়নের দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা, মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।

ষষ্ঠত, নারী কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং যৌন ও শিশু নিপীড়ন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিন্নমত ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সংগঠনটির ভাষায় ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’ মোকাবিলায় উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সপ্তমত, শ্রম কমিশনের সুপারিশ এবং শ্রম আইন ২০২৬ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনঃকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সার সংকট সমাধান এবং কৃষকদের ক্যান্সারসহ দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি রয়েছে।

সরকারি পাটকল, চিনিকল ও অন্যান্য কলকারখানা বেসরকারি খাতে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

অষ্টমত, শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি করা হয়েছে। ছাত্র ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সব ক্ষেত্রে দলীয় পক্ষপাতমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়েছে। বেসরকারি খাতে নিরাপদ ও জেন্ডার-সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

নবমত, প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সব উন্নয়ন প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে অল্টারনেটিভস। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি বন্যা, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

অল্টারনেটিভস বলছে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংবিধান, অর্থনীতি ও বিভিন্ন সামাজিক খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি জুলাইয়ের আন্দোলন ও এর আগে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *