ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু আলোচনা ও সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবসম্মত সমাধান উদ্ভাবনের আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় দ্রুত মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞানী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রোববার (২৫শে অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। উলবাকিয়া নামের ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ের লক্ষ্যে সভাটি আয়োজন করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এ অবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নেই। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব।
মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শুধু সভা, সেমিনার কিংবা প্রচারমূলক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গবেষণার ফল বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতেও তিনি প্রস্তুত রয়েছেন।
সভায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণে গবেষণার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। সেই পদ্ধতি হতে হবে সাশ্রয়ী এবং বাণিজ্যিকভাবেও কার্যকর। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান ও সামাজিক কল্যাণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
সভায় জানানো হয়, ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণে গবেষণার জন্য টেমাসিক ফাউন্ডেশন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অনুদানে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। প্রকল্পটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করা দেশীয় গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের নিজস্ব প্রযুক্তি, জ্ঞান ও উদ্ভাবন কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত মশা ব্যবহার করে ডেঙ্গুর মতো রোগের জীবাণু ছড়ানোর ক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, উপযুক্ত প্রজাতির মশায় উলবাকিয়া প্রতিষ্ঠিত হলে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে স্থানীয় পরিবেশ, মশার প্রজাতি, প্রয়োগপদ্ধতি ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের ওপর। তাই বাংলাদেশে এর প্রয়োগের আগে স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় বাংলাদেশে নিযুক্ত সিঙ্গাপুরের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফিলিপ অং বক্তব্য দেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান, বংশগতিবিজ্ঞান ও রোগপ্রতিরোধবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ঝিয়ং শিও সভায় বক্তব্য দেন। এ ছাড়া সিমবায়োসিয়া এসইএর প্রধান নির্বাহী ডেভিড কুয়েক ইয়ং কি তাঁর দলের সদস্যদের নিয়ে অংশ নেন।
সভায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. মঈনুল ইসলাম, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান সামিনা আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম. ফিরোজ জামান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশারসহ সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা সভায় অংশ নেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ, স্থানীয় গবেষকদের সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি, বাস্তবায়নপদ্ধতি ও সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সভায় জানানো হয়নি।
আরো পড়ুন : জাইকার সহায়তায় সাত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আধুনিক রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা