বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) নির্বাচিত নির্বাহী কমিটি থেকে তিন দিনে নয়জন কর্মকর্তার পদত্যাগ ঘিরে দেশের ক্রীড়া প্রশাসনে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পদত্যাগের কারণ, ফেডারেশনগুলোর প্রতিনিধিত্ব পরিবর্তন এবং কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সচিবকে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিওএ একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। বর্তমান নির্বাহী কমিটিও বর্তমান সরকারের আগে গঠিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গেও কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সেনাপ্রধান ঘটনাটি যাচাই করছেন বলেও তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে।
মাছরাঙা স্পোর্টসে প্রচারিত প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর পদত্যাগের ঘটনাটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। তবে পদত্যাগের পেছনে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ ছিল কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
১৩ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বিওএর নয়জন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। তাঁদের মধ্যে দুই সহসভাপতি, একজন উপমহাসচিব এবং ছয়জন নির্বাহী সদস্য রয়েছেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে আছেন সরওয়াত সিরাজ শুক্লা, নাঈম আশফাক চৌধুরী, এম এ কুদ্দুস খান, সৈয়দ রুম্মন বিন ওয়ালী সাব্বির, হাবিবুর রহমান জামিল, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মাকসুদ আলম, ফারহাদ জেসমিন লিটি ও আব্দুল্লাহেল বাকী।
বিওএর বর্তমান সংকটের পেছনে জাতীয় ক্রীড়া সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ১৮ জুলাই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ২৭টি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন ও সংগঠনের আগের অ্যাডহক কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন করে। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিওএর গঠনতন্ত্রে জাতীয় ফেডারেশনগুলোর প্রতিনিধিত্ব, সদস্যপদ এবং নির্বাহী কমিটির কার্যক্রম পরিচালনার নিয়ম নির্ধারিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ফেডারেশনের প্রতিনিধি মনোনয়নে নির্বাহী কমিটির অনুমোদনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। ৮(খ) অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধিত্ব প্রত্যাহারের বিধান প্রাসঙ্গিক।
তাই কোনো ফেডারেশনের কমিটি পরিবর্তনের পর বিওএর প্রতিনিধি পরিবর্তন করতে হলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্বাহী কমিটির গঠন, ভোটাধিকার এবং সভার বৈধতা নির্ধারণে গঠনতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো পর্যালোচনা করা দরকার।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সনদেও জাতীয় অলিম্পিক কমিটির স্বায়ত্তশাসন রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করা গেলেও অলিম্পিক কমিটির স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রাখার নীতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনায় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সনদের কোনো বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রীর ঘোষিত উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও পরিধির ওপর। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রথমত, নয়জন কর্মকর্তার পদত্যাগপত্র এবং তাঁদের প্রকাশিত বক্তব্য পর্যালোচনা করতে হবে। পদত্যাগের কারণগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, পদত্যাগে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ফোনালাপ, বার্তা ও যোগাযোগের তথ্য আইনসম্মতভাবে যাচাই করা যেতে পারে। অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বক্তব্যও নিতে হবে।
তৃতীয়ত, ২৭টি ফেডারেশনের পুনর্গঠন, কাউন্সিলর মনোনয়ন এবং বিওএর নির্বাহী কমিটির নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা দরকার। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তার অগ্রগতিও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তার আইনগত এখতিয়ারের মধ্যে প্রশাসনিক বিষয়গুলো যাচাই করতে পারে। অন্যদিকে, বিওএর সদস্যপদ, পদত্যাগ এবং নির্বাহী সিদ্ধান্তের প্রশ্নগুলো সংস্থাটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির লিখিত মতামত নেওয়াও সহায়ক হতে পারে।
বিওএর বর্তমান পরিস্থিতি কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার পদত্যাগের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে দেশের ক্রীড়া প্রশাসনের স্থিতিশীলতা, ফেডারেশনগুলোর প্রতিনিধিত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের স্বার্থ জড়িত।
ক্রীড়া প্রশাসনে সংস্কার প্রয়োজন হলে তা হতে হবে স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক ও প্রমাণভিত্তিক। একই সঙ্গে নির্বাচিত কমিটির বৈধ অধিকার এবং অলিম্পিক সংস্থার সাংগঠনিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর ঘোষিত তদন্ত উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গ্রহণ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি ছাড়া বিতর্কের অবসান হবে না।
সবশেষে, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের ভবিষ্যৎ। নিয়ম মেনে তদন্ত, গঠনতান্ত্রিক সমাধান এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই পারে বিওএর বর্তমান সংকট কাটিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে।
আরো পড়ুন : ৯ গোলের ধাক্কায় বাংলাদেশের ফুটবলে উঠছে নানা প্রশ্ন