৯ গোলের ধাক্কায় বাংলাদেশের ফুটবলে উঠছে নানা প্রশ্ন

ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ৯-২ গোলে হারের পর বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা

জাকার্তায় ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে হারের পর বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের ম্যাচের সময়সূচির বাইরে চলাফেরা, কোচ থমাস ডুলির কৌশল ও খেলোয়াড় নির্বাচন, তরুণ ফুটবলারদের ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা তীব্র হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের নৈশক্লাবে অবস্থানের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে সাদ উদ্দিন ও সোহেল রানা জুনিয়রকে দেখা গেছে । ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মুছে ফেলা হয়। একজন ইন্দোনেশীয় নারী দাবি করেছিলেন, তিনি নৈশক্লাবে বাংলাদেশের জাতীয় দলের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তারা তাকে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে ছবিগুলো ঠিক কখন তোলা হয়েছিল, তা ওই পোস্ট থেকে নিশ্চিত করা যায়নি।

ঘটনাটি দলের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের চলাফেরার ওপর দলের নিয়ন্ত্রণ কতটা ছিল, সেটি এখন আলোচনার বিষয়।

সমালোচনার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্য মাঠের ফলাফল। ১লা অক্টোবর জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে হারে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধেই ছয় গোল হজম করে দলটি। ইন্দোনেশিয়ার মিচেল বেকার একাই করেন পাঁচ গোল। বাংলাদেশের হয়ে গোল করেন শাহরিয়ার ইমন ও ফারহান আলী ওয়াহিদ।

এর আগে প্রতিযোগিতার প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে বাংলাদেশ হারে ৩-০ গোলে। দ্বিতীয় ম্যাচে সিঙ্গাপুরের কাছে হার ১-০ গোলে। ফলে তিন ম্যাচে কোনো পয়েন্ট না পেয়েই প্রতিযোগিতা শেষ করে বাংলাদেশ।

ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে নয় গোল হজম বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে বিব্রতকর হয়ে ওঠে। এটি তিন বছরের মধ্যে দলের সবচেয়ে বড় পরাজয়। এর আগে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৭-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ।

থমাস ডুলি ২২শে মে বাংলাদেশের জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তার নিয়োগের সময় যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হিসেবে তার অভিজ্ঞতা এবং কোচ হিসেবে ফিলিপাইন ও গায়ানায় কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিল। গায়ানার দায়িত্বে চার ম্যাচে চার জয়ও ছিল তার সাম্প্রতিক রেকর্ডে।

কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে তার দলের খেলার ধরন নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে পরপর তিন ম্যাচে বাংলাদেশ মাত্র দুই গোল করেছে এবং হজম করেছে ১৩ গোল।

অবশ্য কোনো কোচের নির্দিষ্ট খেলার ধরন তৈরি হয়েছে কি না, তা কয়েকটি ম্যাচের ফল দিয়ে এককভাবে নির্ধারণ করা যায় না। দলটির নতুন খেলোয়াড়, বিদেশে বেড়ে ওঠা ফুটবলার এবং নতুন কোচিং কাঠামোর সমন্বয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

ডুলি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছিল, তিনি তরুণ খেলোয়াড়দের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চান।

ডুলির বিরুদ্ধে তরুণ ফুটবলারদের প্রতি বিরূপ মনোভাবের অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠেছে। তবে এই অভিযোগের সঙ্গে সাম্প্রতিক দল নির্বাচনের তথ্য পুরোপুরি মেলে না। ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতার জন্য ডুলি ২৩ সদস্যের দলে ফারহান আলী ওয়াহিদ, জিদান ইউসুফ ও শূকি ইতোফুসাকে অন্তর্ভুক্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গোলরক্ষক সাইফ কেরাওয়ালা অবশ্য চূড়ান্ত দলে ছিলেন না।

ফারহানকে নিয়ে ডুলির অবস্থানও প্রকাশ্যে ইতিবাচক ছিল। দল ঘোষণার সময় তিনি ফারহানের গোল করার দক্ষতার প্রশংসা করেন। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে ফারহানই বাংলাদেশের দ্বিতীয় গোলটি করেন। ফারহানকে ঘিরে কোচের সঙ্গে বিরোধের গুঞ্জনও ছড়িয়েছিল। ইন্দোনেশীয় সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে হোটেল ছাড়ার ইচ্ছার গুঞ্জনের কথা বলা হয়। তবে ডুলি প্রকাশ্যে সেই বিরোধের কথা অস্বীকার করেন।

জাতীয় দলের সঙ্গে বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের যুক্ত করার বিষয়টি ডুলির দায়িত্বকালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফারহান, জিদান ও শূকির অন্তর্ভুক্তি তারই অংশ।

অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও চলতি বছরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ জেরার্ড জোনসকে ঘিরে দলীয় প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আগস্টে উজবেকিস্তান যাওয়ার আগে দলের সংবাদ সম্মেলনেও জোনস ও খেলোয়াড়েরা উপস্থিত ছিলেন না।

ডুলির নিয়োগের আগে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন জাতীয় দলের প্রধান কোচের জন্য প্রায় ২৭০টি আবেদন পাওয়ার কথা জানিয়েছিল। ক্রিস কোলম্যানের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ডুলিকে দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

ফেডারেশনের বর্তমান কারিগরি পরিচালক সাইফুল বারী টিটু। টিটু ব্যক্তিগত স্বার্থে ডুলিকে নিয়োগ দিয়েছেন এমন অভিযোগও রয়েছে কারো কারো। যদিও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জাতীয় দলের সহকারী কোচ হাসান আল মামুনকে ঘিরে ম্যাচের আগে দলের তথ্য ফাঁস এবং অর্থের বিনিময়ে তথ্য দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও ছড়িয়েছে। তার বিরুদ্ধে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

ডুলির নিয়োগের সময় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তাকে দীর্ঘমেয়াদি দল গঠনের জন্য অভিজ্ঞ কোচ হিসেবে তুলে ধরেছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর তার কোচিং দলে আরও কয়েকজন বিদেশি কোচও যুক্ত হয়েছেন। আগস্টে রাইনহার্ড স্টুম্ফ, নগুয়েন হোয়াং লান ও ক্রিস্টিয়ান বারবুসচাককে কোচিং কাঠামোয় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ফলে এখন প্রশ্ন শুধু একটি ম্যাচের ফল নিয়ে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই কোচিং কাঠামো থেকে বাংলাদেশ কী ধরনের দল তৈরি করতে চাইছে। খেলোয়াড় নির্বাচন কীভাবে হচ্ছে। স্থানীয় ও বিদেশে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের কীভাবে একসঙ্গে ব্যবহার করা হবে। এবং দলের মাঠের কৌশল কতটা পরিষ্কার ও ধারাবাহিক হবে।

ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের পর এসব প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। তবে নৈশক্লাবের ছবি থেকে শুরু করে দলীয় গোষ্ঠী, তথ্য ফাঁস বা ব্যক্তিগত স্বার্থের অভিযোগ—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়, কোচ ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।

বর্তমান বাস্তবতায় নিশ্চিত তথ্য হলো, ডুলির অধীনে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় তিন ম্যাচের তিনটিতেই হেরেছে এবং শেষ ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। এখন কোচিং ব্যবস্থাপনা, খেলোয়াড় নির্বাচন ও দলের শৃঙ্খলা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *