মানুষ, নদী আর কল্পনায় মাসুদ চৌধুরীর অন্য এক পৃথিবী

প্রকৃতি, গাছপালা ও ধূসর ভূদৃশ্য নিয়ে মাসুদ চৌধুরীর চিত্রকর্ম

ঢাকায় শুরু হয়েছে চিত্রশিল্পী মাসুদ চৌধুরীর একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘কল্পনায় আমাদের গ্রহ’। ধানমন্ডির সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ২৯টি চিত্রকর্ম। ২রা অক্টোবর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ৬ই অক্টোবর, বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

১৯৬২ সালে বরিশালে জন্ম নেওয়া মাসুদ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস থেকে শিল্পকলায় পাঠ নেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি চিত্রকলায় কাজ করছেন। এর আগে ১৯৯৩ সালে বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরিতে তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে সফিউদ্দিন শিল্পালয়েও তাঁর একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বর্তমান প্রদর্শনীতে শিল্পীর সাম্প্রতিক সময়ের পাশাপাশি গত কয়েক বছরের কিছু কাজও রয়েছে। ক্যানভাসে তেলরং ও অ্যাক্রিলিক রঙে করা এসব চিত্রে মানুষের মুখ, নৌকা, নদী, প্রকৃতি, পাখি ও ঘুড়ির মতো পরিচিত উপাদান দেখা যায়। তবে পরিচিত দৃশ্যকে তিনি সরাসরি বাস্তবতার অনুকরণে উপস্থাপন করেননি। রঙ, রেখা ও প্রতীকের মাধ্যমে সেগুলোকে নতুন অর্থ দিয়েছেন।

প্রদর্শনীর বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে মানুষের মুখ। কোথাও মুখ একা, কোথাও দুটি মুখ পাশাপাশি। কোনো মুখ আবার বৃত্তাকার প্রবেশপথের মতো কাঠামোর মধ্যে দেখা যায়। দুটি মুখকে খাঁচার মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায়ও দেখা যায়। এসব কাজে মানুষের পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মঅনুসন্ধানের মতো বিষয় সামনে আসে।

নারী প্রতিকৃতিও প্রদর্শনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শাড়ি, টিপ ও অলংকারের মতো সাংস্কৃতিক চিহ্ন এসব ছবিতে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে নারীর উপস্থিতিকে যুক্ত করেছে। আবার কিছু কাজে মুখের ওপর ক্রসচিহ্ন বা কালো আঁচড় রয়েছে। এসব চিত্রে দৃশ্যমানতা, বাধা, দমন কিংবা প্রতিবাদের নানা ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মাসুদ চৌধুরীর কাজে রঙের ব্যবহারও আলাদা করে চোখে পড়ে। বেগুনি, নীল, কমলা, গোলাপি, সবুজ ও লাল রঙের পাশাপাশি তিনি কিছু চিত্রে ধূসর ও প্রায় একরঙা আবহ তৈরি করেছেন। উজ্জ্বল রঙের কাজগুলোর পাশে ধূসর বন বা নিস্তরঙ্গ ভূদৃশ্যের মতো ছবি প্রদর্শনীতে ভিন্ন আবহ তৈরি করেছে।

নৌকা ও নদীর চিত্রগুলোতে বাংলাদেশের জলভূমির পরিচিত দৃশ্য ফিরে এসেছে। কোথাও একটি নৌকা বিস্তৃত রঙিন জলের মধ্যে রয়েছে। কোথাও একাধিক নৌকা সারিবদ্ধ। নৌকার প্রতিফলনও এসেছে কিছু কাজে। এসব চিত্রে নদীকে শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবে নয়, চলাচল ও জীবনের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও পড়া যায়।

প্রকৃতির চিত্রগুলোতে সবুজ, গাছপালা ও গ্রামীণ ভূদৃশ্যের পাশাপাশি ধূসরতার উপস্থিতি রয়েছে। ফলে প্রদর্শনীতে প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং তার বিপরীতে শূন্যতা বা পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। তবে এসব কাজকে সরাসরি জলবায়ু সংকটের বক্তব্য হিসেবে দেখার চেয়ে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে শিল্পীর নিজস্ব ভাবনার অংশ হিসেবে দেখা বেশি সংগত।

কবুতর, বক এবং ঘুড়ির মতো উপাদানও প্রদর্শনীতে রয়েছে। বিশেষ করে ঘুড়ির চিত্রে বাংলার পরিচিত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে রঙ ও গতির মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে প্রদর্শনীতে ব্যক্তিগত কল্পনার পাশাপাশি স্থানীয় জীবন ও সংস্কৃতির ছাপও স্পষ্ট।

শিল্পীর তুলির কাজে কখনো মোটা ও দৃশ্যমান রঙের স্তর দেখা যায়। কোথাও আবার সরু রেখা, রঙের ফোঁটা ও আঁচড় ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু চিত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখের ওপর রেখা টানা হয়েছে। এতে ছবির প্রচলিত সৌন্দর্য ভেঙে দিয়ে অস্বস্তি ও প্রশ্নের জায়গা তৈরি হয়েছে।

মাসুদ চৌধুরীর ভাষায়, চিত্রশিল্প শুধু দৃশ্যমান শিল্পকলা নয়। এটি শিল্পীর অনুভূতি, দর্শন ও সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। তাঁর বর্তমান প্রদর্শনীর কাজগুলোতেও সেই ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের ছাপ রয়েছে।

প্রদর্শনীতে একই সঙ্গে উজ্জ্বল ও বিষণ্ণ আবহের কাজ রয়েছে। কোথাও রঙের তীব্রতা ছবিকে প্রাণবন্ত করেছে। কোথাও সীমিত রঙ ও ধূসরতা তৈরি করেছে নীরব পরিবেশ। ফলে পুরো আয়োজনকে এক ধরনের একক দৃশ্যভাষার মধ্যে রাখা গেলেও প্রতিটি কাজের প্রকাশভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে।

মাসুদ চৌধুরীর শিল্পচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পরিচিত উপাদানকে বিমূর্ত ও অর্ধবিমূর্ত রূপে ব্যবহার করা। নৌকা, নারী, গাছ বা মানুষের মুখ তাঁর ছবিতে সরাসরি বাস্তবতার প্রতিরূপ হয়ে থাকে না। এগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতি, অনুভূতি ও কল্পনার বাহক।

‘কল্পনায় আমাদের গ্রহ’ নামটিও সেই বিস্তৃত ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। এখানে গ্রহ বলতে শুধু পৃথিবীর ভৌগোলিক অস্তিত্ব বোঝানো হয়নি। মানুষের ভেতরের জগৎ, তার সম্পর্ক, স্মৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও এসব ছবির পাঠের অংশ হয়ে ওঠে।

ধানমন্ডির সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীটি ৬ই অক্টোবর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শিল্পীর দীর্ঘ সময়ের চিত্রচর্চার বিভিন্ন দিক দেখার পাশাপাশি তাঁর সাম্প্রতিক ভাবনা ও দৃশ্যভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে এ আয়োজন।

 

আরও পড়ুন: অন্তরের ছয় রিপু ও প্রকৃতির সংকট নিয়ে ড. আবু কালাম শামসুদ্দিনের শিল্পভাষ্য

One thought on “মানুষ, নদী আর কল্পনায় মাসুদ চৌধুরীর অন্য এক পৃথিবী”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *