ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সংশোধনী নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটির অভিযোগ, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের পরিবর্তে ভারী শিল্পকারখানার অনুমোদন, বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ এবং পূর্বাচল ও ঝিলমিল এলাকায় ভবনের আয়তন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নগরের পরিবেশ ও পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিআইপি বলছে, গত ১২ই অক্টোবরের সংশোধনী এবং ১৪ই অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব পরিবর্তন কীভাবে, কার মতামতের ভিত্তিতে এবং কোন কারিগরি যুক্তিতে করা হয়েছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এক বিবৃতিতে বিআইপি জানায়, পর্যাপ্ত কারিগরি মূল্যায়ন, পেশাজীবীদের মতামত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা ছাড়া নগর পরিকল্পনার মৌলিক নির্দেশনায় পরিবর্তন আনা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
বিআইপির মতে, নগরের উন্মুক্ত স্থান শুধু অব্যবহৃত জমি নয়। এগুলো নাগরিকদের সুস্থ জীবনযাপন, বিনোদন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য নগর গড়তেও এসব স্থানের প্রয়োজন রয়েছে।
সংগঠনটির আশঙ্কা, পরিকল্পনায় উন্মুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারিত জমিতে ভারী শিল্পকারখানার অনুমোদন দেওয়া হলে নগরের সামগ্রিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, নাগরিক সুবিধা ও জীবনযাত্রার মানের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তার বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রকাশের দাবি জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে উন্মুক্ত স্থানের নির্ধারিত ব্যবহার পরিবর্তন করলে সৃষ্ট ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে বিআইপি।
বিআইপির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংশোধনীগুলো প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পেশাজীবীদের মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সংগঠনটির দাবি, পেশাগত পর্যায়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং বিআইপির সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন না বলে জানা গেছে। বিষয়টি সত্য হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে। বিআইপির আশঙ্কা, সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে জনস্বার্থ ও পরিকল্পনাগত প্রয়োজনের তুলনায় কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ড্যাপের সংশোধনী নিয়ে ছয়টি দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স।
প্রথমত, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবহার ও ভারী শিল্পকারখানার অনুমোদনসংক্রান্ত সংশোধনীগুলো স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যালোচনায় জনস্বার্থবিরোধী বা পরিকল্পনাগতভাবে অযৌক্তিক পরিবর্তন প্রমাণিত হলে সেগুলো বাতিল করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সংশোধনী প্রণয়ন ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থসংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, সংশোধনীর ফলে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, নগরের বাসযোগ্যতা, ভূমি ব্যবহারের ভারসাম্য ও নাগরিক সুবিধার ওপর কী প্রভাব পড়বে, তার বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রকাশ করতে হবে। উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি হলে তা পূরণের পরিকল্পনাও দিতে হবে।
চতুর্থত, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিআইপি, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিবর্তনের আগে পেশাগত মতামত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
পঞ্চমত, সংশোধনীগুলো কেন করা হয়েছে, কোন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হয়েছে এবং এর পেছনে কী কারিগরি যুক্তি রয়েছে, সে বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
ষষ্ঠত, নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়নে কৌশলগত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছে বিআইপি।
বিআইপির মতে, নগর পরিকল্পনা কোনো তাৎক্ষণিক বা বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি একটি সমন্বিত ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ঢাকার মতো জনবহুল মহানগরে ভূমি ব্যবহারের অপরিকল্পিত পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে পারে।
সংগঠনটি সংশ্লিষ্ট সংশোধনীগুলো পুনর্বিবেচনা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বাতিল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
বিআইপির বক্তব্য, ঢাকার পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্তে জনস্বার্থ, পরিবেশগত ভারসাম্য, পেশাগত উৎকর্ষ ও নাগরিক অধিকারের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
আরো পড়ুন : গুলশান-ধানমণ্ডিসহ পাঁচ লেকের দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ